দেড় বছর স্কুলে না গিয়েও হাজিরা খাতায় উপস্থিত, বেতনও নিচ্ছেন শিক্ষক
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ ২২:১২
ছবি: সংগৃহীত
বরগুনার আন্ধার মানিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জুয়েল মিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত হাজিরা খাতায় উপস্থিতি দেখানো এবং মাস শেষে বেতন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দেড় বছর ধরে বিদ্যালয়ে নিয়মিত না গিয়ে তিনি বরগুনা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের দাফতরিক কাজে যুক্ত রয়েছেন। শিক্ষক সংকটের কারণে বিদ্যালয়ের পাঠদান যেখানে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেখানে একজন সহকারী শিক্ষককে দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের বাইরে রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অভিভাবকরা।
বুধবার (১৯ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে আন্ধার মানিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে সহকারী শিক্ষক জুয়েল মিয়াকে পাওয়া যায়নি। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুয়েল মিয়া দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। উপজেলা শিক্ষা অফিসের দাফতরিক কাজে তাকে ব্যস্ত রাখা হয়েছে বলে জানান তারা।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক প্রায় দেড় বছর আগে অবসরে যাওয়ার পর থেকেই পদটি শূন্য রয়েছে। বর্তমানে চারজন সহকারী শিক্ষক দিয়ে চলছে বিদ্যালয়ের পাঠদান। এর মধ্যে একমাত্র পুরুষ শিক্ষক জুয়েল মিয়া দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষক সংকটে পাঠদান চালিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানোর জন্য একজন শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ তাকে বিদ্যালয়ে না রেখে উপজেলা শিক্ষা অফিসের দাফতরিক কাজে ব্যবহার করার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তাদের দাবি, শিক্ষক সংকটের মধ্যে একজন শিক্ষককে অন্য দফতরের কাজে ব্যবহার করায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত জুয়েল মিয়াকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে এনে নিয়মিত পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে তার হাজিরা নিয়ে। দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কীভাবে হাজিরা খাতায় তাকে নিয়মিত উপস্থিত দেখানো হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা।
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষক মো. জুয়েল মিয়া বলেন, ‘অফিসের প্রয়োজনে আমাকে এখানে এনেছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা বললে আবার আমি স্কুলে ফিরে যাব। আমার কী করার আছে। আমাকে শিক্ষা কর্মকর্তারা যেখানে রাখবেন, সেখানেই যেতে হবে।’
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, ‘আমাদের জুয়েল স্যার অনেক দিন ধরে স্কুলে আসেন না। এ কারণে আমাদের ঠিকমতো ক্লাস হয় না। এখন যদি আমাদের নিয়মিত পড়ানো না হয়, তাহলে আমরা কীভাবে শিখব? আমাদের প্রধান শিক্ষকও নেই, আবার জুয়েল স্যারও স্কুলে আসেন না। আমরা চাই, আমাদের শিক্ষককে নিয়মিত স্কুলে ফিরিয়ে এনে ভালোভাবে পাঠদান করানো হোক।’
বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির নবগঠিত সহসভাপতি মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমাদের এখানে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর আগে স্কুলের বিষয়ে কোনো ভূমিকা নিতে পারিনি। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রায় দেড় বছর আগে অবসরে গেছেন। এখন কাগজে-কলমে দেখি চারজন শিক্ষক, কিন্তু বাস্তবে দেখি তিনজন। এর মধ্যে একজন আবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তিনিও অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকেন। অন্যদের মধ্যে একজন ছুটিতে গেলে স্কুল একদম ফাঁকা হয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘একমাত্র পুরুষ শিক্ষক জুয়েল মিয়াকে উপজেলা শিক্ষা অফিসে রাখা হয়েছে। এখন স্কুলে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়েছে। আমরা ওই শিক্ষককে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছি।’
এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা জেরিনা আক্তার বলেন, ‘অফিসে কম্পিউটারভিত্তিক কাজ করার মতো লোকবল না থাকায় প্রয়োজনীয় কাজগুলো জুয়েল মিয়াকে দিয়ে করানো হচ্ছে। এটাও কি নিয়মভিত্তিক করতে হবে? জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছি, কোনো ফিডব্যাক দেননি। এখন আমি কোনো উপায় না পেয়ে জুয়েলের মাধ্যমে অফিসিয়াল কাজগুলো করাচ্ছি।’
দেড় বছর ধরে একজন শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও কীভাবে হাজিরা খাতায় নিয়মিত উপস্থিতি দেখানো হচ্ছে- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবকরা।
