বিশ্বকাপ জয়ের মাঠে এবার হৃদয়ের ব্যাটে ডাবল সেঞ্চুরির মহাকাব্য
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫:০৪
ছবি: সংগৃহীত
পচেফস্ট্রুমের সেনওয়েস পার্কে হয়তো আজও লেগে আছে চার বছর আগের সেই উল্লাসের রেশ। এই মাঠেই একদিন বাংলাদেশের কিশোরেরা লিখেছিল ইতিহাস; উড়েছিল বিশ্বকাপের পতাকা, উঠেছিল বিজয়ের ট্রফি। সেই দলেরই একজন ছিলেন তাওহীদ হৃদয়।
চার বছর পর সেই একই মাঠে আবারও তাঁর ব্যাটে জ্বলে উঠল বাংলাদেশের ক্রিকেটের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়। এবার হাতে ট্রফি নয়, ব্যাট। আর ব্যাটের ভাষায় লেখা হলো দুই শতকের এক দীর্ঘ, ধৈর্যশীল, মুগ্ধকর কবিতা।
দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে দ্বিতীয় আনঅফিসিয়াল টেস্টের শুরুটা অবশ্য বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির ছিল না। স্বাগতিকেরা প্রথম ইনিংসে তুলে নেয় ৫১২ রানের বিশাল পাহাড়। জবাবে দ্বিতীয় দিন শেষে ৫৭ ওভারে ৪ উইকেটে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ২০১ রান। স্কোরবোর্ড তখন যেন বাংলাদেশের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এক কঠিন প্রাচীর।
তৃতীয় দিনের সকালটা তাই ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায়।
হৃদয় ও জাকের আলী সেই অপেক্ষার উত্তর দিলেন ব্যাটে। ধৈর্যের সঙ্গে তাঁরা বুনতে থাকলেন রানের জাল, একটির পর একটি বলকে ঠেলে দিতে থাকলেন সীমানার ওপারে। তাঁদের ১৫৫ রানের জুটিতে ধীরে ধীরে বদলে গেল ম্যাচের রং। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের চোখে তখন চাপ, বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে ফিরতে শুরু করল আশার আলো।
জাকের আলী থামলেন ৯৪ রানে। মাত্র ছয় রানের আক্ষেপ নিয়ে ফিরলেন তিনি। ১৫৫ বলের ইনিংসটিতে সেঞ্চুরির সুবাস ছড়িয়ে পড়েছিল অনেক দূর। কিন্তু জাকেরের বিদায়েও থামল না হৃদয়ের পথচলা।
বরং সঙ্গী বদলাল, গল্প এগিয়ে গেল।
মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনকে পাশে নিয়ে হৃদয় যেন একাই সময়ের সঙ্গে লড়তে থাকলেন। বোলার বদলেছে, বল বদলেছে, মাঠের আলো বদলেছে—কিন্তু বদলায়নি তাঁর ধৈর্য। প্রতিটি রান যেন তিনি তুলে নিচ্ছিলেন খুব যত্নে, খুব নিঃশব্দে। ৭৩টি সিঙ্গেল, ১৭টি ডাবল-একেকটি রান যেন একেকটি পাথর, যার ওপর দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হলো বিশাল এক মিনার।
তারপর এল সেই মুহূর্ত।
৩৩৫ বলের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে হৃদয় ছুঁয়ে ফেললেন ডাবল সেঞ্চুরির মায়াবী সীমারেখা। ২২টি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো তাঁর ইনিংস তখন শুধু একটি সংখ্যা নয়; হয়ে উঠেছে ফিরে আসার গল্প, অপেক্ষার গল্প, শৈশবের স্বপ্ন থেকে পরিণত ক্রিকেটারের হয়ে ওঠার গল্প।
চার বছর আগে যে মাঠে তাঁর চোখে ছিল বিশ্বকাপ জয়ের আলো, সেই মাঠেই আজ তাঁর ব্যাটে ফুটল দুই শতকের সূর্য।
আর অন্য প্রান্তে সাইফউদ্দিনও কম যাননি। তাঁর ব্যাটেও তখন আশির ঘরের ছন্দ। দুজনের ব্যাটে চড়ে বাংলাদেশের ইনিংস এগিয়ে চলেছে স্বাগতিকদের বিশাল সংগ্রহের দিকে।
১৩৭.১ ওভার শেষে বাংলাদেশের স্কোর ৪৬৬ রান। দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের চেয়ে ব্যবধান এখন মাত্র ৪৫।
সেনওয়েস পার্কের সবুজ ঘাসে আজ যেন সময়ের দুই প্রান্ত এসে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে। এক প্রান্তে চার বছর আগের বিশ্বকাপজয়ী কিশোর হৃদয়, অন্য প্রান্তে আজকের পরিণত ক্রিকেটার হৃদয়। মাঝখানে কেটে গেছে চারটি বছর—স্বপ্ন, সংগ্রাম, অপেক্ষা আর নিজেকে প্রমাণ করার নিরন্তর পথ।
বিশ্বকাপের সেই মাঠে আবারও হৃদয়ের জয়গান।
এবার ট্রফি নেই, নেই বিজয়ের মঞ্চও। আছে শুধু একটি ব্যাট, ৩৩৫ বল এবং তার ভেতর থেকে উঠে আসা দুইশ রানের এক অমলিন কবিতা।
