শিরোনাম
বাড়ছে দুধকুমারের পানি, বাড়তে পারে সুরমা-কুশিয়ারারও সিলেটে বৃষ্টির আভাস, দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত শ্রীমঙ্গলে পাহাড়িকা এক্সপ্রেস উদ্ধারে পাঠানো উদ্ধারকারী ট্রেনও লাইনচ্যুত সিলামে ফের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, প্রাণ গেল যুবকের তিন বছর তালাবদ্ধ ৩৬ কোটি টাকার ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি সিলেটসহ সারাদেশে প্রাথমিকের নতুন শিক্ষকদের পদায়ন পেছালো নিজের ঘর সামলান, তারপর অন্যকে নসিহত: জামায়াতকে প্রধানমন্ত্রী ‘হুজুর মাথা টিপার কথা বলে রুমে ডেকে প্যান্ট খুলে ফেলতেন’-নির্যাতিত শিশুর বর্ণনা কুলাউড়ায় খাসিয়া পুঞ্জিতে তাণ্ডব, ৮ হাজারের অধিক পানগাছ কর্তন​ সিলেটে ভারতীয় অ/স্ত্রসহ কোটি টাকার চালান জব্দ

https://www.emjanews.com/

19249

sylhet

প্রকাশিত

০২ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩৯

সিলেট

তিন বছর তালাবদ্ধ ৩৬ কোটি টাকার ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি

থমকে আছে সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্যশিক্ষার সম্ভাবনা

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩৯

ছবি: সংগৃহীত

সুনামগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবার সংকট দীর্ঘদিনের। চিকিৎসক, নার্সের পাশাপাশি দক্ষ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টেরও রয়েছে ঘাটতি। এমন বাস্তবতায় প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) হতে পারত দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির অন্যতম কেন্দ্র। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর প্রায় তিন বছর ধরে তালাবদ্ধ পড়ে আছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে একদিকে নষ্ট হচ্ছে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো, অন্যদিকে পিছিয়ে পড়ছে জেলার স্বাস্থ্যশিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের সম্ভাবনা।

সুনামগঞ্জ পৌর শহরের সরকারি কলেজের পেছনে আলীপাড়া এলাকায় তিন একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে সুনামগঞ্জ ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল দুই বছরে। কিন্তু নানা জটিলতা ও কাজ বন্ধ থাকার কারণে সময় লেগেছে প্রায় পাঁচ বছর।

নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি চালু হয়নি। কেটে গেছে আরও প্রায় তিন বছর। এরই মধ্যে ঝকঝকে নতুন ভবনগুলোর দেয়ালে কালচে ছাপ পড়েছে, কোথাও খসে পড়েছে পলেস্তারা। তালাবদ্ধ কক্ষগুলোতে জমেছে ধুলাবালু; অনেক জায়গায় বাসা বেঁধেছে পোকামাকড়। আটটি ভবন নিয়ে গড়ে ওঠা পুরো ক্যাম্পাস এখন অনেকটা পরিত্যক্ত স্থাপনার মতো পড়ে আছে।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ক্যাম্পাসটির কাজ করেছে মেসার্স বিবিএল অ্যান্ড এমটি (জেবি)। একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, ছাত্রীনিবাস, আবাসিক ভবন, কর্মকর্তাদের কোয়ার্টার, গ্যারেজ ও বিদ্যুতের সাবস্টেশনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো রয়েছে সেখানে। বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

তবে অবকাঠামো প্রস্তুত হলেও প্রতিষ্ঠানটি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল এখনো নিয়োগ হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন অধ্যক্ষসহ প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রয়োজন হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় পদ সৃজন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়াও এখনো সম্পন্ন হয়নি।

অবকাঠামো আছে, নেই কার্যক্রম
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সীমানাপ্রাচীরঘেরা ক্যাম্পাসটির মূল ফটকে তালা। ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়ে চারতলা একাডেমিক ভবন। কাচের দরজাগুলোও তালাবদ্ধ। মেঝেতে ধুলা ও ময়লা জমে আছে। বিভিন্ন স্থানে উঠে গেছে দেয়ালের রং।

ক্যাম্পাসে রয়েছে চারতলা ছাত্রাবাস, দুটি তিনতলা কোয়ার্টার ভবন, প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের জন্য দোতলা আবাসিক ভবন এবং বড় ছাত্রীনিবাস। পশ্চিম পাশে রয়েছে গ্যারেজ ও বিদ্যুতের সাবস্টেশন।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাস দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা সেলিম আহমদ বলেন, নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এখন তাঁরা শুধু ভবনগুলো দেখাশোনা করছেন।

অর্থাৎ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও সেখানে এখনো কোনো শিক্ষার্থী নেই, নেই শ্রেণিকক্ষের পাঠদান কিংবা স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।

স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটে নতুন সম্ভাবনা
সুনামগঞ্জে সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট রয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক, নার্স ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এই বাস্তবতায় আইএইচটি চালু হলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হবে। এসএসসি পাসের পর শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয়ে ল্যাবরেটরি, ফিজিওথেরাপি, রেডিওলজি ও ইমেজিং, রেডিওথেরাপিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

এর ফলে একদিকে সুনামগঞ্জ থেকেই দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি হবে, অন্যদিকে জেলার স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিদ্যমান জনবল সংকট কিছুটা পূরণের সুযোগ তৈরি হবে।

সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় চিকিৎসক, নার্স ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টসহ বিভিন্ন পদেই জনবলের ঘাটতি রয়েছে। আইএইচটি চালু হলে স্থানীয় অনেক শিক্ষার্থী এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কাজের সুযোগ পাবেন।

জনস্বাস্থ্য সচেতনতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ
হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ও সচেতনতার ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে শুধু চিকিৎসক বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, আধুনিক রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা তৈরি।

এই জায়গায় আইএইচটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দক্ষ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট তৈরির পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞান ও সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে হাওর এলাকার তরুণদের স্বাস্থ্য প্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এর সুফল সরাসরি জেলার মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি, রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমেও প্রশিক্ষিত জনবল ভূমিকা রাখতে পারে।

হস্তান্তর নিয়ে জটিলতা
প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্যশিক্ষা বিভাগের অধীন। একপর্যায়ে এটি জেলা সিভিল সার্জনের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন। এরপরও কার্যক্রম শুরু হয়নি।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী খালেদ মো. সাইফুল্লাহ বলেন, দ্রুত প্রতিষ্ঠানটি হস্তান্তরের চেষ্টা চলছে। তবে তার আগে কিছু সংস্কারকাজ করা প্রয়োজন। ভবনগুলো দীর্ঘদিন এভাবে পড়ে থাকলে আরও ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

অন্যদিকে একই কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ইফতে খায়ের আলম বলেন, প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ না হওয়ার কারণেই মূলত প্রতিষ্ঠানটি চালু হচ্ছে না। লোকবল নিয়োগ হলেই এটি চালু করা সম্ভব হবে।

অপেক্ষা আর কত?
ক্যাম্পাসের পাশের বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, প্রায় এক বছর আগে ঢাকার কিছু কর্মকর্তা এসে প্রতিষ্ঠানটি দেখে গিয়েছিলেন। তখন তাঁদের ধারণা হয়েছিল, দ্রুত কার্যক্রম শুরু হবে। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হয়নি।

সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য মোহাম্মদ রাজু আহমেদ বলেন, প্রতিষ্ঠানটি চালুর বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলা হয়েছে। তিন বছর ধরে ভবনগুলো পড়ে থাকা দুঃখজনক। সুনামগঞ্জে এমনিতেই শিক্ষার সুযোগ সীমিত। তাই বিশেষায়িত এই প্রতিষ্ঠান দ্রুত চালু হওয়া প্রয়োজন।

প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস যদি বছরের পর বছর তালাবদ্ধ পড়ে থাকে, তাহলে তা শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জেলার স্বাস্থ্যশিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের সম্ভাবনাও।

সুনামগঞ্জে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির সুযোগ সৃষ্টি, স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবার জনবল সংকট কমানো এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে আইএইচটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এখন প্রয়োজন দ্রুত জনবল কাঠামো অনুমোদন, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু করা।

হাওরকন্যা সুনামগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবার ভিত শক্ত করতে ৩৬ কোটি টাকার এই অবকাঠামো আর কতদিন তালাবদ্ধ থাকবে; এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।