ট্রাম্পের ‘যুদ্ধবিরতি ঘোষণার’ পরও ইউক্রেনের ছয় জ্বালানি স্থাপনায় রাশিয়ার হামলা
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ১০:২৪
ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেনের ছয়টি জ্বালানি স্থাপনায় রাশিয়া হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
রোববার ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা জানান। তবে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া ইউক্রেনের গ্যাস স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা উক্রিনফর্মের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ হামলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের গ্রিড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির ইজিয়ুম শহরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিম ইউক্রেনের জ্বালানি ও রেল অবকাঠামোতেও রাতভর হামলা চালানো হয়েছে।
সোমবার রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে যে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যেত, ইউক্রেন তা পাওয়ার যোগ্য নয়।
জেলেনস্কি জানান, দেশজুড়ে জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলায় ৩৩ জন আহত হয়েছেন। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমরা হামলা চালাইনি, অথচ রাশিয়া আমাদের গ্যাস স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি পুতিনের জবাব।’
ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংস্থা উক্রেনেরগো সোমবার জানিয়েছে, রুশ হামলায় বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় খারকিভ, দোনেৎস্ক ও জাপোরিঝঝিয়ায় নতুন করে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জামের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে রেশনিং চালু করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জেলেনস্কি বলেন, এসব হামলা প্রমাণ করে যে রাশিয়া জ্বালানি অবকাঠামোয় যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
সোমবার সন্ধ্যায় কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো টেলিগ্রামে জানান, শহরের দারনিৎস্কি এলাকায় একটি ড্রোন ২৫ তলা আবাসিক ভবনে আঘাত হেনেছে। ভবনটির আঙিনায় থাকা কয়েকটি গাড়িতেও আগুন ধরে যায়। এ ঘটনায় একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক
রোববার ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পর জেলেনস্কি বলেছিলেন, এ ধরনের কোনো যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে-এ বিষয়ে তিনি আগে কিছু জানতেন না। তবে তিনি প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই এগিয়ে এসে রাশিয়াকে শর্ত মেনে চলতে বাধ্য করে, তাহলে এটি যুদ্ধ শেষ করার পথে একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।
সোমবার যুদ্ধবিরতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বলেছি, তোমরা রাজি-তাই তারা রাজি হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতেই হবে।
ট্রাম্পের ভাষায়, ‘সংখ্যাগুলো দেখলে বোঝা যায়, এই যুদ্ধ একটি বিপর্যয়।’
জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলা
কয়েক মাস ধরে রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। এতে উভয় দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
মস্কোর দাবি, ইউক্রেনের সামরিক অভিযান পরিচালনায় সহায়তা করে এমন স্থাপনাগুলো বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু। অন্যদিকে, রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে ইউক্রেনের হামলাকে যুদ্ধের অর্থায়ন কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন জেলেনস্কি।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আসন্ন শীতের আগে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বাড়িয়েছে।
২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন তেল ও গ্যাস স্থাপনায় ২৭৩টি হামলার তথ্য নথিভুক্ত করেছে বিবিসি ভেরিফাই। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১২৪টি।
অন্যদিকে, সশস্ত্র সংঘাতের তথ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি)-এর সংকলিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের এ পর্যন্ত ইউক্রেনের জ্বালানি নেটওয়ার্ককে প্রভাবিত করা রুশ হামলার সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৪ গুণ।
রাশিয়ার তেল বাণিজ্য ও মার্কিন স্বার্থ
রাশিয়ার তেল অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের জন্য ইউক্রেনের ওপর চাপ দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। এর উদ্দেশ্য, রাশিয়ার সঙ্গে সম্প্রতি হওয়া চুক্তির আওতায় দেশটি যেন যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে ডিজেল সরবরাহ করতে পারে।
এই চুক্তির ফলে জ্বালানি আমদানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছে। জেলেনস্কি এ সিদ্ধান্তকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য ‘উপহার’ বলে অভিহিত করেছেন।
এদিকে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, অবিলম্বে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি যুদ্ধবিরতি কার্যকরের বিষয়ে ট্রাম্পের আহ্বানকে যুক্তরাজ্য জোরালোভাবে সমর্থন করে। ফ্রান্স, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও এ উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
তবে ইউরোপের কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া একরকম নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকরভাবে বজায় থাকলে জোটটি তা স্বাগত জানাবে। সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে তিনি বলেন, রাশিয়া যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে-এমন কোনো প্রমাণ এখনো দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে না।
