সিলেট টেস্টে শুরুতেই বাংলাদেশের ছন্দপতন, হাসানের আগুনের পর ব্যাটিংয়ে জোড়া ধাক্কা
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ ১৪:১৭
ছবি: সংগৃহীত
সিলেটের আকাশে তখন শীতের নরম পরশ। অথচ মাঠের লড়াইয়ে উত্তাপের কমতি নেই। প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৩৫৬ রানে আটকে দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। বল হাতে হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে আশার আলোও জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু ব্যাট হাতে ইনিংস শুরু করতেই সেই আলোয় যেন কিছুটা মেঘ জমল। ২২ রান তুলতেই নেই দুই ওপেনার। শুরুতেই বিপাকে বাংলাদেশ।
হাসানের আগুনে পুড়ল ক্যারিবীয় ব্যাটিং
প্রথম দিনের লড়াইয়ে আমির জাঙ্গুর ব্যাট যেন হয়ে উঠেছিল অবিচল এক প্রাচীর। অভিষেক টেস্টেই শতকের দেখা পেয়েছেন এই ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যান। তাঁর ১৩৩ রানের ইনিংসের সঙ্গে কেভিন উইকহ্যামের ৬১ ও জাস্টিন গ্রিভসের ৫১ রানে ভর করে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
তবে বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে একাই যেন প্রতিরোধের নাম হয়ে উঠেছিলেন হাসান মাহমুদ। গতি, সুইং আর নিখুঁত লাইন-লেংথের মিশেলে ক্যারিবীয় ব্যাটিং লাইনআপে একের পর এক আঘাত হেনেছেন তিনি।
প্রথম দিনে তাসকিন আহমেদের আঘাতের পর হাসানের বোলিংয়ে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দ্বিতীয় দিনেও থামেনি তাঁর দাপট। একে একে তুলে নিয়েছেন আরও তিন উইকেট। শামার জোসেফকে বোল্ড করে পূর্ণ করেছেন ছয় উইকেটের কীর্তি।
শেষ পর্যন্ত ৯০ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ইনিংস শেষ করেছেন হাসান। টেস্ট ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো এক ইনিংসে ছয় উইকেট পেলেন তিনি। বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে টেস্টে সর্বোচ্চ পাঁচ উইকেটের ইনিংসের মালিকও এখন হাসান। তাঁর আরেকটি কীর্তি, টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে স্টাম্পিংয়ে উইকেট নেওয়া।
অন্যদিকে, নাথান লায়নের পর দ্বিতীয় বোলার হিসেবে প্রথম পাঁচটি টেস্ট ফাইফার পাঁচটি ভিন্ন দেশে পাওয়ার অনন্য রেকর্ডও গড়েছেন তিনি।
তাসকিন পেয়েছেন দুটি উইকেট, মেহেদী হাসান মিরাজের শিকার দুটি। তাইজুল ইসলাম ও নাঈম হাসান উইকেটশূন্য থেকেছেন।
শেষ জুটির প্রতিরোধ, ৩৫৬-তে থামল ওয়েস্ট ইন্ডিজ
ক্যারিবীয়দের ইনিংসটা আরও আগে গুটিয়ে ফেলার সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। কিন্তু শেষ দিকে জোমেল ওয়ারিক্যান ও জেইডেন সিলসের প্রতিরোধে কিছুটা দীর্ঘ হয়েছে অপেক্ষা। শেষ উইকেট জুটিতে এসেছে ৩৩ রান।
অবশেষে মিরাজের আঘাতে ভাঙে সেই জুটি। ১০৬.৩ ওভারে ৩৫৬ রানে থামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস।
স্কোরবোর্ডে ৩৫৬ রান থাকলেও বাংলাদেশের বোলিংয়ের গল্পে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হাসান মাহমুদ।
সাদমানের চোটে বদলে গেল উদ্বোধনী জুটি
৩৫৬ রানের জবাবে ব্যাটিংয়ে নামার আগে বাংলাদেশের পরিকল্পনায় আসে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন। সাদমান ইসলামের বাঁ পায়ের অ্যাঙ্কেল মচকে যাওয়ায় ওপেনিংয়ে নামতে হয় নাঈম হাসানকে।
যে নাঈম প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও কখনো ওপেন করেননি, তাঁকেই নিতে হয় নতুন দায়িত্ব। আগের টেস্টে ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটি পাওয়া এই বোলিং অলরাউন্ডারের জন্য কাজটি ছিল একেবারেই ভিন্ন।
তানজিদ হাসানের সঙ্গে ইনিংসের সূচনা করলেও সেই জুটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জেইডেন সিলসের বলে স্লিপে ব্র্যান্ডন কিংয়ের হাতে ক্যাচ দিয়ে মাত্র ৫ রানেই ফিরেছেন নাঈম।
এরপর তিন নম্বরে ব্যাট হাতে নামেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
তানজিদের বিদায়ে বাড়ল দুশ্চিন্তা
নাঈমের বিদায়ের ধাক্কা সামলে ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তানজিদ। কিন্তু নবম ওভারে কেভিন গ্রিভসের বলে বড় শট খেলতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনেন তিনি।
অফ স্টাম্পের বাইরের ফুল লেংথের বল পেয়ে উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসে খেলতে চেয়েছিলেন তানজিদ। কিন্তু পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকা অভিষিক্ত কেভিন উইকহ্যাম ডান দিকে ঝাঁপিয়ে দুই হাতে বলটি তালুবন্দী করেন। দুর্দান্ত এক ক্যাচে শেষ হয় তানজিদের ইনিংস।
১৬ রান করে ফিরেছেন এই বাঁহাতি ওপেনার।
বাংলাদেশের স্কোর তখন ৯ ওভারে ২২ রান, হারিয়েছে দুই উইকেট।
সামনে কঠিন পথ, প্রয়োজন ধৈর্যের পরীক্ষা
ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৩৫৬ রানে আটকে দিয়ে ম্যাচে ফেরার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা কাজে লাগাতে হলে এখন দায়িত্ব নিতে হবে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের।
ক্রিজে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। তাঁর সঙ্গে প্রয়োজন দায়িত্বশীল জুটি। কারণ টেস্ট ক্রিকেট কেবল রান তোলার খেলা নয়, ধৈর্য, সংযম আর সময়ের সঙ্গে লড়াই করার নামও।
সিলেটের উইকেটে হাসান তাঁর কাজটা করেছেন। এবার ব্যাট হাতে সেই লড়াইয়ের উত্তর দেওয়ার পালা বাংলাদেশের।
বল হাতে হাসানের গল্পটা ছিল বীরত্বের, ব্যাট হাতে বাংলাদেশের গল্পটা এখনো লেখা বাকি।
