মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগে নতুন স্কিম স্থগিত
শেষ মুহূর্তে এজেন্ডা থেকে সরালেন আনোয়ার
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ ২০:৫১
ছবি: সংগৃহীত
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত নতুন ও বিতর্কিত একটি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেও শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম মন্ত্রিসভার বৈঠকের এজেন্ডা থেকে প্রস্তাবটি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
মঙ্গলবার (৭ মে) দ্য এজ মালয়েশিয়া-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলাকালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ সংক্রান্ত নতুন স্কিমটি আলোচনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তবে বৈঠকের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ করেই এটি তালিকা থেকে বাদ দিতে নির্দেশ দেন।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপনের আগেই আনোয়ার কর্মকর্তাদের এজেন্ডা থেকে এটি সরিয়ে পরবর্তী বিষয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কেন এটি বাদ দেওয়া হলো, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যাও দেননি তিনি।
বিদেশি শ্রমিক সংক্রান্ত বিষয়গুলো মূলত মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। তবে সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রী—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল এবং মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি আর. রামানান এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি রামানান নিশ্চিত করেন, দ্য ইউনিভার্সাল রিক্রুটমেন্ট অ্যাডভান্স প্ল্যাটফর্ম (টোরাপ) নামে একটি নতুন ব্যবস্থা বিবেচনায় রয়েছে। এটি প্রস্তাব করেছে বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডি, যার মালিক বর্তমানে বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার আসামি হিসেবে ওয়ান্টেড বলে জানা গেছে।
মানবসম্পদমন্ত্রী দাবি করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোই হবে এই প্ল্যাটফর্মের মূল লক্ষ্য। তবে একাধিক সূত্রের দাবি, প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় আলোচনার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল এবং অনুমোদন পেলে বাস্তবায়নও শুরু হয়ে যেত।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মালয়েশিয়ার ডিএপির সাবেক সংসদ সদস্য চার্লস সান্তিয়াগো। তার মতে, বাংলাদেশে গ্রাম পর্যায়ে শ্রমিক শোষণ ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রবণতা বন্ধ না হলে প্রযুক্তি ব্যবহার করেও সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
বর্তমানে বিদেশি শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পরিচালনা করছে বেস্টিনেট। ২০২৮ সালের মধ্যে এটি ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেটেড ইমিগ্রেশন সিস্টেম দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বেস্টিনেটের নিয়ন্ত্রক দাতুক সেরি আমিনুল ইসলাম মোহদ নূর এবং তার সহযোগী রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অর্থপাচার ও শ্রমিক শোষণের অভিযোগ রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে চাইলেও এখন পর্যন্ত আমিনুলকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে একজন বাংলাদেশির খরচ ছিল প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। কিন্তু বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি যুক্ত হওয়ার পর এ খরচ বেড়ে বর্তমানে ৫ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি হয়েছে।
বাংলাদেশি নথি অনুযায়ী, শুধু ২০২৩ সালেই ৩ লাখ ৫১ হাজারের বেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গেছেন। প্রত্যেকে গড়ে ৫ হাজার ডলার ব্যয় করলে এ খাত থেকে প্রায় ৭ বিলিয়ন রিঙ্গিত বিভিন্ন পর্যায়ের এজেন্টদের হাতে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ১০২টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর অনুমোদন পেলেও নতুন সরকার আরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ৪২৬টি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানের তালিকা মালয়েশিয়ার কাছে জমা দিয়েছে বাংলাদেশ।
তবে ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শ্রমিক প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। কারণ, অনেক শ্রমিক কাজ ছাড়াই দেশটিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন।
বাংলাদেশ এখন নতুন করে শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার পাশাপাশি আরও বেশি রিক্রুটিং কোম্পানিকে সুযোগ দেওয়ার পক্ষে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া সীমিতসংখ্যক কোম্পানিকে নিয়ে নতুন কাঠামো বিবেচনা করছে, যেখানে বেস্টিনেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
