ক্যাবো ভার্দে হারলেও মাথা নত করেনি, ভোজিনহার দুর্দান্ত লড়াই
কষ্টার্জিত জয়ে শেষ ষোলতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ানরা
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ ০৭:০৪
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রাতটি সহজ হওয়ার কথা ছিল। নামের পাশে ইতিহাস, অভিজ্ঞতা আর তারকার ঝলক; সবই ছিল আর্জেন্টিনার। কিন্তু ফুটবল যে শুধু পরিসংখ্যানের খেলা নয়, তা আরও একবার মনে করিয়ে দিল আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র ক্যাবো ভার্দে।
১২০ মিনিটের মহারণে তারা যেন প্রতিটি আর্জেন্টাইন আক্রমণের জবাব লিখে রেখেছিল নিজেদের হৃদয়ের পাতায়। একবার নয়, দু'দুবার পিছিয়ে পড়েও ফিরে এসেছে। প্রতিটি বলের জন্য লড়েছে, প্রতিটি ট্যাকলে আগুন ঝরিয়েছে, প্রতিটি আক্রমণে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণভাগকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটন বুঝি জন্ম নিতে যাচ্ছে।
ম্যাচের শুরুতেই বোঝা গিয়েছিল, ক্যাবো ভার্দে আত্মসমর্পণ করতে মাঠে নামেনি। তারা ভয় পায়নি লিওনেল মেসির নামকে, ভয় পায়নি আর্জেন্টিনার জার্সিকেও। বরং সাহস, গতি আর শৃঙ্খলাকে অস্ত্র বানিয়ে একের পর এক পাল্টা আক্রমণে তারা বারবার উন্মোচন করেছে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের দুর্বলতা।
বিশেষ করে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও তাঁর সঙ্গীদের ঘিরে গড়ে ওঠা রক্ষণভাগকে বেশ কয়েকবার এলোমেলো করে দেন দেরয় দুয়ার্তে, সিডনি কাবরাল ও রায়ান মেন্দেসরা। আর্জেন্টিনার ডিফেন্সে সমন্বয়ের ঘাটতি, ফাঁকা জায়গা ছেড়ে দেওয়া এবং চাপের মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত; সবকিছুই নির্মমভাবে প্রকাশ করে দেয় ক্যাবো ভার্দে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণ যে এখনও পুরোপুরি দুর্ভেদ্য নয়, এই ম্যাচ যেন তারই বড় প্রমাণ।
আর গোলপোস্টের নিচে ভোজিনহা ছিলেন যেন এক অদম্য প্রাচীর। একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভে তিনি হতাশ করেছেন লিওনেল মেসিসহ আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে। কখনো একা ছুটে আসা মেসিকে ফিরিয়েছেন, কখনো বুদ্ধিদীপ্ত ফ্রি-কিক ঠেকিয়ে দিয়েছেন অসাধারণ ক্ষিপ্রতায়। তাঁর গ্লাভস যেন প্রতিবারই বলছিল; ‘এখনও শেষ হয়নি।’
তবু এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যখন একজন ফুটবলার পুরো ম্যাচের গল্পটাই বদলে দেন। সেই নামটি আবারও লিওনেল মেসি।
যখন আর্জেন্টিনা আটকে যাচ্ছিল, তখন তাঁর পায়ের জাদু পথ দেখায়। নিখুঁত ফিনিশিংয়ে দলকে এগিয়ে দেন, আবার অতিরিক্ত সময়ে তাঁর নেওয়া কর্নার থেকেই আসে জয়সূচক গোলের সূত্রপাত। স্কোরশিটে শেষ গোলটি আত্মঘাতী হিসেবে লেখা থাকলেও, সেই আক্রমণের স্থপতি ছিলেন মেসিই। যেন সংকটের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে তিনিই হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার ভরসার শেষ ঠিকানা।
অন্যদিকে ক্যাবো ভার্দের দুই গোল ছিল সাহস, আত্মবিশ্বাস আর সৌন্দর্যের প্রতীক। বিশেষ করে সিডনি কাবরালের বাঁকানো শটটি ছিল শিল্পীর তুলির শেষ আঁচড়ের মতো; যে গোলের সৌন্দর্য বহুদিন স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে। গোল করার পর গ্যালারিতে ছুটে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে উদ্যাপনের দৃশ্য ফুটবলের আবেগকে আরও গভীর করেছে।
শেষ পর্যন্ত স্কোরবোর্ড বলছে, আর্জেন্টিনা ৩–২, ক্যাবো ভার্দে ২। বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা উঠে গেছে শেষ ষোলোয়। কিন্তু সংখ্যার এই জয় পুরো গল্প বলে না।
আসল গল্পটি লিখে গেছে ক্যাবো ভার্দে। তারা হারলেও মাথা নত করেনি। শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে, প্রতিটি মুহূর্তে বিশ্বাস করিয়েছে—অসম্ভবও সম্ভব হতে পারে।
আর আর্জেন্টিনা? তারা জিতেছে ঠিকই, কিন্তু এই জয় তাদের মনে করিয়ে দিল; শুধু মেসির জাদু দিয়ে প্রতিবার বিপদ পার হওয়া যায়, তবে বিশ্বকাপের কঠিন পথ পাড়ি দিতে হলে রক্ষণভাগকে আরও দৃঢ়, আরও নির্ভুল হতে হবে।
কখনও কখনও পরাজিত দলই সবচেয়ে বড় করতালি নিয়ে মাঠ ছাড়ে। এই রাতে সেই করতালির প্রকৃত দাবিদার ক্যাবো ভার্দে। আর বিজয়ের মুকুট পরে মাঠ ছেড়েছে আর্জেন্টিনা; যার কেন্দ্রে ছিলেন, আছেন এবং আবারও প্রমাণ করলেন, লিওনেল মেসি।
