শিরোনাম
আনন্দভ্রমণে মৃত্যু: টাঙ্গুয়ার হাওরে ৪ মাসে ৫ প্রাণহানি, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন স্লিপার বাস বন্ধ ও ইটিসি সিস্টেম চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর হবিগঞ্জে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঝটিকা পরিদর্শন: চিকিৎসক বরখাস্তের নির্দেশ স্থানীয় নির্বাচন: জনপ্রিয়তা-গ্রহণযোগ্যতা-ত্যাগে জোর, বিদ্রোহীদের নিয়ে সতর্ক বিএনপি সিলেটে যে অপরাধে ধরা পড়লেন ২৬ জন হবিগঞ্জে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হ/ত্যা সিলেট সীমান্তে ২৯ লক্ষ টাকার চো/রাচালানী মালামাল জব্দ ৫৩৮ মরদেহ উদ্ধার, আরও ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকিতে নেপাল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত: বিনা খরচে যাবে ১০ হাজার কর্মী অবশেষে সুনাই নদীতে নৌকাবাইচ, উৎসবে মাতল বিয়ানীবাজার

https://www.emjanews.com/

18191

tourism

প্রকাশিত

২৯ আগস্ট ২০২৬ ২১:৩২

পর্যটন

আনন্দভ্রমণে মৃত্যু: টাঙ্গুয়ার হাওরে ৪ মাসে ৫ প্রাণহানি, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ ২১:৩২

ছবি: সংগৃহীত

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে গিয়ে গত চার মাসে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আগস্টের ২০ দিনেই প্রাণ গেছে তিনজনের। কখনো চলন্ত হাউসবোট থেকে পড়ে, কখনো গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে, আবার কখনো নৌকার ইঞ্জিনে পড়ে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাজশাহী থেকে বেড়াতে আসা এক শিক্ষার্থী হাওরের পানিতে ডুবে মারা যান।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও নিরাপত্তা বিধি মানার ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যেই উদাসীনতা রয়েছে। পর্যটকদের লাইফ জ্যাকেট না পরা, নৌযানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম না রাখা এবং চলন্ত নৌযান থেকে পানিতে নামার মতো অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।

সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলায় টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থান। প্রায় ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর আয়তনের এই হাওরে ছোট-বড় ১০৯টি বিল রয়েছে। বর্ষায় বিল, খাল ও নালা একাকার হয়ে বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়। বর্তমানে পর্যটকদের কাছে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণস্থল। হাওরে দুই শতাধিক হাউসবোট এবং প্রায় চার শতাধিক নৌযান পর্যটক বহন করে থাকে।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার টাঙ্গুয়ার হাওরে গোসল করতে গিয়ে মারা যান রাজশাহী নগরের নওদাপাড়ার বাসিন্দা শিক্ষার্থী আবদুল মাজেদ (২৪)। সকালে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে তাহিরপুর ঘাট থেকে হাউসবোটে হাওরে রওনা হন তিনি। লামাগাঁও এলাকায় বোটটি একটি বাজারের ঘাটে থামলে গোসল করতে পানিতে ঝাঁপ দেন মাজেদ। এরপর আর ভেসে ওঠেননি তিনি। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁর লাশ উদ্ধার করেন।

এর আগে ২১ আগস্ট পরিবারের সঙ্গে হাওরে বেড়াতে এসে চলন্ত হাউসবোট থেকে পড়ে মারা যায় ফরিদপুরের শিশু রোকাইয়া নূর (১০)। একদিন পর হাওরের পানিতে তার লাশ ভেসে ওঠে।

৭ আগস্ট গোলাবাড়ি এলাকায় হাউসবোট থেকে গোসল করতে নেমে পানিতে তলিয়ে মারা যান সিরাজগঞ্জ থেকে পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে আসা আলী আকবর খান (৭২)।

এ ছাড়া ৬ জুন পরিবারের সঙ্গে হাওরে বেড়াতে এসে নৌকার ইঞ্জিনে পড়ে মারা যায় ধর্মপাশার কামলাবাজ গ্রামের শিশু মৌমাতা সরকার (৮)। ৩০ মে নৌকার ছাদে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে দলবেঁধে নাচার সময় পানিতে পড়ে মারা যায় তামিম ইসলাম (১৭)। গত বছরের ১৫ আগস্ট সিলেট থেকে মা-বাবার সঙ্গে হাওরে বেড়াতে এসে নৌকার জানালা দিয়ে পানিতে পড়ে মারা যায় শিশু মাসুম আহমদ (৫)।

এদিকে গত বছরের ৬ নভেম্বর সরকার ‘টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ’ জারি করে। এরপর ৩ আগস্ট টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং পর্যটনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ১৩ দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করে জেলা প্রশাসন।

নির্দেশনায় পর্যটকবাহী হাউসবোট ও নৌযানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, লাইফ জ্যাকেট ও লাইফবয় রিং রাখা এবং পরিবেশ রক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অনেক হাউসবোট ও নৌযান এসব নির্দেশনা মানছে না। গত চার মাসে মারা যাওয়া রোকাইয়া, আলী আকবর, তামিম কিংবা আবদুল মাজেদের কারও গায়ে লাইফ জ্যাকেট ছিল না।

হাওরপাড়ের বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, প্রশাসনের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কঠোর হতে হবে। নিয়ম মানলে দুর্ঘটনা যেমন কমবে, তেমনি হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতিও কমবে। কিন্তু বর্তমানে হাওরে কোনো শৃঙ্খলা নেই, যে যার মতো চলছে।

২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত ‘টাঙ্গুয়ার হাওর সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি’র সভায় জানানো হয়, এ পর্যন্ত মাত্র ৪৯টি হাউসবোট ও নৌযান নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে। সভায় হাউসবোট অ্যাসোসিয়েশন ও তাহিরপুর নৌকা মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আবেদন করার জন্য আরও দুই দিন সময় চাওয়া হয়।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান। সভায় হাউসবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আরাফাত হোসাইন উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, হাওরে বর্তমানে দুই থেকে আড়াই শ হাউসবোট রয়েছে। বিভিন্ন দিক থেকে নৌকা ও হাউসবোট হাওরে প্রবেশ করায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক বোটে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামও নেই। তবে নিয়ম মেনে চলা হাউসবোটও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মতিউর রহমান খান বলেন, প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর সপ্তাহে দুই দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। নিবন্ধন ছাড়া কোনো নৌযান পর্যটক বহন করতে পারবে না। এ জন্য দুই দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এরপর আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, এখন প্রথম কাজ হচ্ছে সব নৌযানকে নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং প্রশাসনের দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন, নৌযানের মালিক-শ্রমিক ও পর্যটক- সবার সচেতনতা ও আন্তরিকতা প্রয়োজন।