শিরোনাম
প্রবাসীদের বিমান ভাড়া নিয়ে সুখবর, কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার হবিগঞ্জ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি যুবক নিহত সিলেটে টাকা ফেরত চাওয়ায় ভাইয়ের হাতে বোন খু/ন সিলেটে যে সময়ে ঘটবে ভয়াবহ লোডশেডিং সিলেটে ২৯ জন গ্রেফ/তার: প্রায় ২শ যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আনন্দভ্রমণে মৃত্যু: টাঙ্গুয়ার হাওরে ৪ মাসে ৫ প্রাণহানি, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন স্লিপার বাস বন্ধ ও ইটিসি সিস্টেম চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর হবিগঞ্জে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঝটিকা পরিদর্শন: চিকিৎসক বরখাস্তের নির্দেশ স্থানীয় নির্বাচন: জনপ্রিয়তা-গ্রহণযোগ্যতা-ত্যাগে জোর, বিদ্রোহীদের নিয়ে সতর্ক বিএনপি সিলেটে যে অপরাধে ধরা পড়লেন ২৬ জন

https://www.emjanews.com/

18224

sylhet

প্রকাশিত

৩১ আগস্ট ২০২৬ ০০:২৬

সিলেট

বড়লেখায় মুন্নির মৃত্যুর পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন উধাও!

হত্যার অভিযোগ পরিবারের

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ ০০:২৬

ছবি: সংগৃহীত

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার মুন্নির মৃত্যুর পর তাঁর শ্বশুরবাড়িকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একের পর এক প্রশ্ন। মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারের চার সদস্য; ননদ, মেঝো জা, শাশুড়ি ও মেঝো ভাসুরকে বাড়িতে দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের থাকার ঘরগুলোও তালাবদ্ধ। অন্যদিকে, মৃত্যুর আগে মুন্নির পাঠানো ভিডিও ও খুদে বার্তা, নিখোঁজ মুঠোফোন এবং শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকার অভিযোগ ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

তবে এখনো ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা-তা নিশ্চিত নয়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার ধারণা করছে। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গত ২৯ আগস্ট বিকেলে মুন্নির শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি যে ঘরে থাকতেন, সেই ঘরের স্টিলের দরজায় তালা ঝুলছে। পাশের কয়েকটি ঘরেও তালা দেওয়া। বাড়ির এসব ঘর থেকে কোনো সাড়াশব্দও পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মুন্নির মৃত্যুর পর তাঁর ননদ, মেঝো জা, শাশুড়ি ও মেঝো ভাসুরকে আর বাড়িতে দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের থাকার ঘরগুলোও তালাবদ্ধ।

তবে বাড়ির অন্য একটি ঘরে মুন্নির বড় জাকে পাওয়া যায়। তিনি ও তাঁর স্বামী-মুন্নির বড় ভাসুর; আলাদাভাবে বসবাস করেন। মুন্নির এক বছর বয়সী কন্যাসন্তান বর্তমানে ওই বড় জায়ের কাছে রয়েছে।

মুন্নির মেঝো ভাসুরের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

মুন্নির পরিবারের দাবি, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও তিনি শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা বাবা-মাকে জানিয়েছিলেন। ভিডিও ও খুদে বার্তার মাধ্যমে তিনি এসব কথা জানান।

পরিবারের ভাষ্য, এর আগেও মুন্নি তাঁর বাবা-মাকে বলেছিলেন, ‘ওরা আমাকে যেকোনো সময় মেরে ফেলতে পারে।’

গত ২১ আগস্ট শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে তাঁর বিরোধের পর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ পরিবারের। তখনও তিনি বাবা-মাকে ভিডিও ও খুদে বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি জানান।

মেয়ের কাছ থেকে এমন খবর পেয়ে তাঁর বাবা স্থানীয় কয়েকজন মুরব্বির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বিষয়টি সমাধানের অনুরোধ জানান। পরে এক মুরব্বি তাঁকে ফোন করে জানান, বিরোধ মীমাংসা হয়ে গেছে।

এর কিছুক্ষণ পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি পরিচয়ে এক ব্যক্তি মুন্নির বাবাকে শ্বশুরবাড়িতে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি বাথরুমের কাঠের বীমের সঙ্গে মেয়ের ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান বলে পরিবারের দাবি। বাথরুমের দরজা খোলা ছিল বলেও তাঁরা জানান।

ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিরা মুন্নি আত্মহত্যা করেছেন বলে তাঁর বাবাকে জানান। কিন্তু পরিবারের কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয়নি।

মুন্নির পরিবারের দাবি, মৃত্যুর পর তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এসব আঘাতের ছবি ও ভিডিও তাঁদের কাছে রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে।

পরিবারের প্রশ্ন; মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেই যিনি নির্যাতনের কথা জানাচ্ছিলেন, তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন কীভাবে এলো?

তবে এসব আঘাত কীভাবে হয়েছে, মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না; তা এখনো তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে মুন্নির ব্যবহৃত মুঠোফোনটি। পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে ওই ফোন থেকেই তিনি বাবা-মাকে ভিডিও ও খুদে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর পর থেকে ফোনটি আর পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন, যে ফোনে মৃত্যুর আগে নির্যাতনের অভিযোগের ভিডিও ও বার্তা পাঠানো হয়েছিল, সেটি এখন কোথায়?

তাঁদের দাবি, ফোনটি উদ্ধার করে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হলে মৃত্যুর আগে মুন্নির সঙ্গে কার কার যোগাযোগ হয়েছিল, কী ধরনের বার্তা আদান-প্রদান হয়েছিল এবং ফোনে কোনো ভিডিও বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত ছিল কি না; সেসবের সূত্র মিলতে পারে।

২০২৩ সালে বড়লেখা উপজেলার মুড়িরগুল গ্রামের সৌদি আরবপ্রবাসী মামুনুর রশিদ লাভলুর সঙ্গে পারিবারিকভাবে মুন্নির বিয়ে হয়। পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজনের গালিগালাজ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন মুন্নি। এসব বিষয় তিনি নিয়মিত বাবা-মা ও স্বজনদের জানাতেন বলে দাবি পরিবারের।

সম্প্রতি মুন্নির ননদ, ভাসুর, জা ও শাশুড়ি তাঁর বাবার বাড়ি থেকে পাঁচ লাখ টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বামীর জন্য সৌদি আরবে গাড়ি কেনার কথা বলে এই টাকা চাওয়া হয়। পরে একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিবার ওই টাকা দেয় বলে জানিয়েছে। তবে এরপরও টাকার জন্য চাপ অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ পরিবারের। একপর্যায়ে মুন্নি তাঁর বাবা-মাকে তাঁকে মেরে ফেলার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন বলে দাবি পরিবারের।

মুন্নির পরিবারের অভিযোগ, তাঁরা ঘটনাটিকে হত্যা হিসেবে উল্লেখ করে মামলা করতে চাইলেও থানায় হত্যা মামলা নেওয়া হয়নি। পরে অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি প্রভাবশালী মহল ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং তাঁদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার।

শনিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে মুন্নির পরিবার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, মুঠোফোন উদ্ধার ও ফরেনসিক পরীক্ষা এবং সুরতহাল প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের ছবি-ভিডিও, ভিডিও বার্তা, খুদে বার্তা ও কলের তথ্যসহ সব ধরনের আলামত সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে।

বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান খানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ জানিয়েছে, মুন্নির মৃত্যুর ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেটির তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এখন প্রশ্ন অনেক; মুন্নির মৃত্যুর পর শ্বশুরবাড়ির চার সদস্য কোথায়? তাঁদের ঘরগুলোই বা কেন তালাবদ্ধ? মৃত্যুর আগে যে মুঠোফোন থেকে মুন্নি বাবা-মাকে ভিডিও ও বার্তা পাঠিয়েছিলেন, সেটি কোথায়? শরীরে থাকা আঘাতের চিহ্নের কারণই বা কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তাই মুন্নির মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে;তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে তদন্ত ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের দিকে।