ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ব মানচিত্রে দেশ ও মহাদেশের আয়তন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তি দূর করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ। বহুল ব্যবহৃত মার্কেটর প্রজেকশনের পরিবর্তে ভূমির প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে তুলে ধরে এমন মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দিয়ে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটির পক্ষে ১৬৪টি দেশ ভোট দেয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। তবে প্রস্তাবটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। এর লক্ষ্য শিক্ষা, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল মানচিত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও নির্ভুল মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া।
প্রস্তাবটির পেছনে নেতৃত্ব দিয়েছে আফ্রিকার দেশ টোগো। আফ্রিকান ইউনিয়নও উদ্যোগটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বজুড়ে প্রচলিত মার্কেটর প্রজেকশনের কারণে আফ্রিকা ও বিষুবরেখার কাছাকাছি অন্যান্য অঞ্চলের আয়তন তুলনামূলকভাবে ছোট দেখানোর যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা সংশোধন করা।
জার্মান-ফ্লেমিশ মানচিত্রকার জেরার্ডাস মার্কেটর ১৫৬৯ সালে তার বিখ্যাত প্রজেকশন প্রকাশ করেন। সমুদ্রপথে নৌযানের দিকনির্ণয়ের ক্ষেত্রে এই প্রজেকশন অত্যন্ত কার্যকর ছিল। তবে পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতল কাগজে তুলে ধরতে গিয়ে এতে মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলগুলোর আয়তন অতিরঞ্জিত হয়ে যায়।
ফলে মার্কেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার প্রায় সমান আকারের মনে হতে পারে। বাস্তবে আফ্রিকার আয়তন গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ।
এর বিপরীতে আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মতো বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট দেখায়। ফলে পুরো বিশ্বের ভূখণ্ডের পারস্পরিক আয়তন সম্পর্কে প্রচলিত মানচিত্র অনেক সময় ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।
জাতিসংঘের উদ্যোগের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে Equal Earth projection। এটি ২০১৮ সালে কার্টোগ্রাফার বোজান শাভরিচ, টম প্যাটারসন ও বার্নহার্ড জেনি তৈরি করেন। এটি একটি ‘equal-area’ বা সমক্ষেত্রফল প্রজেকশন—অর্থাৎ মানচিত্রে বিভিন্ন দেশের ও মহাদেশের আপেক্ষিক আয়তন যথাসম্ভব সঠিক অনুপাতে রাখা হয়।
Equal Earth প্রজেকশনটি তৈরি করা হয়েছিল এমন একটি বিশ্ব মানচিত্র দেওয়ার জন্য, যেখানে ভূমির প্রকৃত আয়তন বজায় থাকবে এবং একই সঙ্গে মহাদেশগুলোর আকৃতিও তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকবে।
মার্কেটর কি তাহলে বাতিল হয়ে যাচ্ছে?
না। জাতিসংঘের প্রস্তাবের অর্থ মার্কেটর প্রজেকশন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা নয়। বিশেষ করে নৌ ও বিমান চলাচলের মতো নির্দিষ্ট নেভিগেশন কাজে মার্কেটর প্রজেকশনের ব্যবহার এখনও কার্যকর বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন। নতুন উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বিশ্ব মানচিত্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও সাধারণ ভৌগোলিক উপস্থাপনায় ভূমির প্রকৃত আয়তন আরও সঠিকভাবে তুলে ধরা।
টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসি বলেছেন, উদ্যোগটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সভ্যতার বিরুদ্ধে নয়; বরং বিশ্বকে আরও নির্ভুল ভৌগোলিক বাস্তবতা তুলে ধরার প্রচেষ্টার অংশ। টোগো আগামী কয়েক মাসে আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্য ও অন্যান্য সমর্থক দেশের সঙ্গে নতুন মানচিত্রের ব্যাপক ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা চালানোর পরিকল্পনা করেছে।
জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তের ফলে এখনই বিশ্বের সব মানচিত্র বদলে যাচ্ছে না। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভূমির প্রকৃত আয়তন প্রতিফলিত করে এমন প্রজেকশন ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
