ছবি: সংগৃহীত
ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও জনপ্রিয় নায়কদের একজন সালমান শাহ। অল্প সময়ের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন দর্শকের হৃদয়ের ‘স্বপ্নের নায়ক’। কিন্তু মাত্র ২৪ বছর বয়সে তার আকস্মিক মৃত্যু পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়। সেই মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলো আজ। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে মামলার নতুন তদন্ত ও দেহাবশেষ উত্তোলনের উদ্যোগে রহস্যটি আবারও সামনে এসেছে।
যেভাবে থেমে যায় স্বপ্নের নায়ক
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসায় অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় চিত্রনায়ক সালমান শাহকে। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর। মাত্র কয়েক বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘বুকের ভেতর আগুন’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘আনন্দ অশ্রু’সহ একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। অসংখ্য ভক্ত তখন থেকেই প্রশ্ন তুলতে থাকেন; এটি কি আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হত্যা? তার মৃত্যু শোকে অনেক তরুণী আত্মহত্যা পর্যন্ত করে।
শুরু হয় দীর্ঘ তদন্ত
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে অপমৃত্যু মামলা করা হয়। পরে তার পরিবারের পক্ষ থেকে এটিকে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের দাবি জানানো হয়। ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই সালমানের বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে; এমন অভিযোগ এনে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন।
এরপর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। তার পরিবার সেই প্রতিবেদন মেনে নেয়নি এবং পরবর্তী সময়ে এর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়।
দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্ত ও অনুসন্ধান হলেও সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে আত্মহত্যার তত্ত্ব নিয়ে আপত্তি অব্যাহত থাকে।
২৯ বছর পর হত্যা মামলা
দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে চলা আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা হিসেবে নতুন করে তদন্তের পথ তৈরি হয়। মামলায় তার স্ত্রী সামীরা হক, সামীরার মা লতিফা হক লিও ওরফে লুসি, চলচ্চিত্রের খলনায়ক আশরাফুল হক ডনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়।
৩০ বছর পর দেহাবশেষ উত্তোলনের উদ্যোগ
মামলার নতুন তদন্তে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো সালমান শাহর দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলনের উদ্যোগ। ২০২৬ সালের জুনে আদালত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তার দেহাবশেষ উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেন।
তবে দেহাবশেষ উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েও বাদীপক্ষের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয় এবং তা বাতিলের আবেদন করা হয়।
এর আগে দুই দফা ময়নাতদন্তের তথ্য নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে লাশের পরিবর্তিত পচনশীল অবস্থার কারণে মেডিকেল লিগ্যাল বোর্ড মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি।
সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট তারিখ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় আদালত নতুন করে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
এর আগে মামলার অন্যতম আসামি চলচ্চিত্র অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডেও পাঠানো হয়। অর্থাৎ মৃত্যুর তিন দশক পরও মামলাটির তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান। ফলে সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আদালতের সামনে আসেনি।
তিন দশক পরও একই প্রশ্ন
সালমান শাহর মৃত্যু শুধু একটি তারকার মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্যে পরিণত হয়েছে। একদিকে পুরোনো তদন্তে আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে হত্যার অভিযোগ করে আসছে। নতুন হত্যা মামলা, পুনঃতদন্ত এবং দেহাবশেষ নিয়ে আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশ সেই পুরোনো প্রশ্নকেই আবার সামনে এনেছে।
৩০ বছর পরও সালমান শাহ নেই। কিন্তু তার অভিনীত চলচ্চিত্র, পোশাকের স্টাইল, চুলের কাট এবং অভিনয়ের নিজস্ব ধরন এখনো দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত। মৃত্যুর তিন দশক পরও তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, ‘স্বপ্নের নায়ক’ হিসেবে তার অবস্থান যেন আরও দৃঢ় হয়েছে।
আর তার মৃত্যুর রহস্যের জট খুলবে কি না; এখন সেই উত্তরই অপেক্ষায় তার পরিবার, ভক্ত এবং দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীরা।
