সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা নিয়ে যা বললেন মনিরুল ইসলাম
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫:০৬
ছবি: সংগৃহীত
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে দীর্ঘদিন পর খোলামেলা কথা বলেছেন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম।
ইউটিউবে ‘নবনীতা চৌধুরীর যত কথা’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মাত্র দুই মাস করেছিল। এরপর মামলাটি র্যাবের কাছে চলে যায়। তাঁর ভাষায়, এরপর থেকেই মামলাটি ‘ডিপ ফ্রিজে’ রয়েছে।
মনিরুল ইসলামের দাবি, এই ‘ক্লু-লেস’ মামলায় কোনো বিশেষ গোষ্ঠী জড়িত থাকার তথ্য তাঁর জানা নেই। বরং তিনি মনে করেন, চুরি করতে ঢোকা কোনো মাদকাসক্ত চোরই সাগর ও রুনিকে হত্যা করে থাকতে পারে। তাঁর ধারণা, হত্যার পর ওই ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা বাসা থেকে টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ নিয়ে যায়।
তবে মনিরুল ইসলাম বারবার স্পষ্ট করেছেন, এটি তাঁর অনুমান, তদন্তে প্রমাণিত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। পর্যাপ্ত সময় নিয়ে তদন্ত করতে পারলে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব ছিল বলেও মনে করেন তিনি।
সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন। তখন তাঁদের একমাত্র সন্তান মেঘের বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। ঘটনার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। শুরুতে থানা পুলিশ তদন্ত করলেও পরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব গোয়েন্দা পুলিশকে দেওয়া হয়। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে সেই তদন্তও র্যাবের কাছে যায়।
মনিরুল ইসলাম জানান, ডিবিতে থাকার সময় মাত্র দুই মাস এই মামলার তদন্তের সঙ্গে ডিবি যুক্ত ছিলেন। সে সময় তিনি ডিবির মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডিবি তখন বিভিন্ন সম্ভাব্য দিক সামনে রেখে তদন্ত চালাচ্ছিল। কিন্তু একটি ক্লু-লেস মামলার রহস্য উদঘাটনের জন্য দুই মাস কোনোভাবেই যথেষ্ট সময় নয়। তদন্তে ব্যর্থতার বিষয়ে উচ্চ আদালতে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, পর্যাপ্ত সময় পেলে ডিবি এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে পারবে।
তবে উচ্চ আদালতে এক পর্যায়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তদন্তের দায়িত্ব কোন সংস্থাকে দেওয়া হলে ভালো হবে। সেদিন আদালতে উপস্থিত অনেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর সামনে মনিরুল ইসলাম র্যাবকে দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন বলে জানান। তাঁর যুক্তি ছিল, সে সময় সিআইডির তুলনায় র্যাবের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অনেক বেশি উন্নত ছিল। একই সময়ে র্যাব পুলিশের তদন্ত নিয়েও নানা সমালোচনা করছিল। এসব বিবেচনায় তিনি র্যাবকে তদন্তের জন্য বেশি উপযুক্ত মনে করেছিলেন বলে জানান।
সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকান্ডের সময় মনিরুল ইসলাম ডিবির মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ডিবির যুগ্ম কমিশনার, পরে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান এবং পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময় থেকে মনিরুল পলাতক রয়েছেন। ২০১৪ সালের ১৩ আগষ্ট সরকার তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। দির্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রথমে ভারতে পরে তিনি আমেরিকায় চলে যান বলে জানা যায়। কিছুদিন যাবৎ তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সামনে আসছেন।
র্যাব তদন্তের দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিবির সঙ্গে তাদের তদন্তের কোনো সমন্বয় ছিল না বলেও দাবি করেন মনিরুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, র্যাব দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ বা ডিবি তদন্তে কী পেয়েছে কিংবা কী পায়নি, এসব বিষয়ে তাদের সঙ্গে কখনো বিস্তারিত আলোচনা করেনি। বরং র্যাব নিজেদের পদ্ধতিতে তদন্ত চালিয়েছে।
২০১৫ সালের আগে ব্যক্তিগত যোগাযোগের সূত্রে তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালকের কাছ থেকে পাওয়া একটি তথ্যের কথাও সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন মনিরুল। তাঁর দাবি, ওই সময় র্যাবের মহাপরিচালক তাঁকে বলেছিলেন, মেঘ বড় হলে হয়তো সে হত্যাকাণ্ডের রহস্য নিয়ে কিছু বলতে পারবে।
মামলার তদন্তের সম্ভাব্য একটি ধারা নিয়েও কথা বলেন মনিরুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, র্যাবের তদন্তে এমন একটি ধারণা সামনে ছিল যে সাগর কিংবা রুনির যেকোনো একজনকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। রুনিকে এ ঘটনায় তুলনামূলকভাবে বেশি সম্পৃক্ত মনে করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
তবে ডিবির দুই মাসের তদন্তে সাগর ও রুনির মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল, এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন মনিরুল। একইভাবে সামিট গ্রুপ কিংবা এটিএন বাংলার প্রধান মাহফুজুর রহমানের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়েও ডিবির তদন্তে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
সরকারের নির্দেশে সাগর-রুনিকে হত্যা করা হয়েছিল, এমন দাবিকেও সরাসরি নাকচ করেন মনিরুল ইসলাম। তাঁর মতে, এই দাবি ‘হাস্যকর’। সাগর-রুনির মতো ‘নিরীহ’ সাংবাদিক দম্পতিকে হত্যা করে সরকারের কি লাভ হবে, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিডিআর বিদ্রোহের বিষয়টি যুক্ত করার যে আলোচনা চলছে, সেটিও মানতে নারাজ মনিরুল। তাঁর ভাষ্য, বিডিআর বিদ্রোহের সময় সাগর ও রুনি দুজনই জার্মানিতে ছিলেন। দেশের সাংবাদিকদের কাছেই যেখানে সে সময় কোনো তথ্য ছিল না, সেখানে তাঁরা জার্মানিতে বসে সব তথ্য জেনে গিয়েছিলেন, এমন ধারণা তাঁর কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়।
রোকেয়া প্রাচীকে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টারও সমালোচনা করেন মনিরুল ইসলাম। সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে রোকেয়া প্রাচীর কথোপকথনের প্রসঙ্গ টেনে তাঁকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষ্য, সে সময় রোকেয়া প্রাচী ছিলেন সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের স্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। বর্তমানে তিনি সরকারের সমালোচনা করায় তাঁকে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন মনিরুল।
সাগর-রুনির বাসায় কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে, সে বিষয়েও নিজের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা তুলে ধরেন তিনি। মনিরুল ইসলামের ভাষ্য, বাসার রান্নাঘরের একটি গ্রিল কাটা ছিল। ওই গ্রিল দিয়েই কোনো চোর বাসায় প্রবেশ করে থাকতে পারে। তাঁর অনুমান, শব্দ পেয়ে প্রথমে রুনি ঘুম থেকে জেগে উঠলে চোর তাঁকে ছুরিকাঘাত করে। পরে সাগর জেগে উঠলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়।
তাঁর ধারণা, সাগর চোরের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করেছিলেন। এ কারণে চোর ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে আরও বেশি ছুরিকাঘাত করে এবং বটি দিয়ে আঘাত করতে পারে। এরপর বাসা থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে চোর পালিয়ে যায়।
রুনির শরীরে ছুরিকাঘাতের ধরন ও তাঁর নাইটড্রেস নিয়ে ওঠা প্রশ্নেরও একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেন মনিরুল। তাঁর মতে, ধস্তাধস্তির সময় রুনির পোশাক উপরে উঠে যেতে পারে। এ কারণে পেটে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন থাকলেও পোশাকে একই ধরনের ছুরির আঘাত নাও থাকতে পারে।
তবে এসব বক্তব্যের ক্ষেত্রে তিনি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। এগুলো তাঁর নিজস্ব অনুমান বলেই উল্লেখ করেছেন।
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রুনির পরকীয়া সম্পর্কের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, এমন তত্ত্ব নিয়েও কথা বলেন মনিরুল। রুনির পরকীয়া সম্পর্কের বিষয়টি সাগর জেনে যাওয়ায় প্রেমিকের সহায়তায় রুনি সাগরকে হত্যা করেছিলেন, এমন একটি ধারণা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
মনিরুলের যুক্তি, হত্যাকাণ্ডের সময় সাগর ও রুনি দুজনকেই নাইটড্রেস পরা অবস্থায় পাওয়া যায়। তাই শুধু পোশাক বা ঘটনাস্থলের কিছু আলামতের ভিত্তিতে পরকীয়ার মতো কোনো তত্ত্বকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
হত্যাকাণ্ডের সময় সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান মেঘের বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। এত অল্প বয়সে ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কারণে মেঘ তীব্র ট্রমার মধ্যে ছিল বলে মনে করেন মনিরুল।
তিনি জানান, ঘটনার পর সকাল হলে মেঘ তার দাদিকে ফোন করে বিষয়টি জানায়। পরে মেঘ সোফা টেনে এনে সেটির হাতলে দাঁড়িয়ে দরজা খুলে দিয়েছিল বলেও জানান তিনি।
মেঘ হত্যাকারীদের কাউকে চিনতে পেরেছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, তাকে বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি দেখানো হলেও সে কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। তাঁর মতে, এর অর্থ হত্যাকারী মেঘের পরিচিত কেউ ছিল না।
ডিবির তদন্তে সাগর ও রুনির পরিবারের সদস্যদেরও সন্দেহের বাইরে রাখা হয়নি বলে জানান মনিরুল। তাঁর ভাষ্য, তদন্তকারীরা পরিবারের সদস্যদের বিষয়েও খোঁজখবর নিয়েছিলেন।
তবে তদন্তের একেবারে শুরুর পর্যায়ে ঘটনাস্থল যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা না হওয়াকে মামলার অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন তিনি। মনিরুলের দাবি, পুলিশ পৌঁছানোর আগেই অনেক মানুষ সাগর-রুনির বাসায় ঢুকে পড়েছিলেন। এতে ঘটনাস্থলের ‘ক্রাইম সিন’ নষ্ট হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ আলামতও নষ্ট হয়ে থাকতে পারে।
এই কারণে শুরু থেকেই মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ-আলামতের একটি অংশ হারিয়ে গেছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, একটি ক্লু-লেস মামলার ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলের প্রতিটি আলামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো নষ্ট হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে তদন্তকারীদের জন্য প্রকৃত ঘটনা পুনর্গঠন করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজেদের বাসায় হত্যার শিকার হন এই সাংবাদিক দম্পতি। তখন তাঁদের একমাত্র সন্তান মেঘের বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে এখন মেঘ প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ।
এত বছর পরও মা-বাবার হত্যার বিচার পায়নি মেঘ। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়েও মামলাটির রহস্যের সমাধান হয়নি। পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছরেও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতি আসেনি।
মা-বাবা হত্যার বিচার ও সত্য উদঘাটনের অপেক্ষায় মেঘ এখনো। তদন্ত সংস্থা বদলেছে, তদন্তের সময় বেড়েছে, আদালতে মামলার শুনানি হয়েছে, নানা তত্ত্ব সামনে এসেছে। কিন্তু সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য এখনো অনুদঘাটিত।
মনিরুল ইসলামের সাম্প্রতিক বক্তব্যে আবারও সামনে এসেছে সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোই: কেন মাত্র দুই মাসের মধ্যে ডিবির তদন্ত র্যাবের কাছে চলে গেল, তদন্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে কেন সমন্বয় হলো না, শুরুতেই কেন ঘটনাস্থল যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেল না এবং এত দীর্ঘ সময় পরও কেন হত্যাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হলো না?
তবে মনিরুল ইসলামের সাক্ষাৎকারে উঠে আসা চোর, মাদকাসক্ত ব্যক্তি, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা অন্যান্য সম্ভাব্য কারণের কোনোটিই এখন পর্যন্ত আদালতে প্রমাণিত সত্য নয়। এসব তাঁর বক্তব্য, অনুমান ও পূর্বের তদন্ত-অভিজ্ঞতার বর্ণনা। সাগর-রুনি হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারে কেবল নির্ভরযোগ্য তদন্ত।
