ছবি: সংগৃহীত
পুরোনো ভিনাইল রেকর্ড খুঁজতে গিয়ে এক সংগ্রাহকের হাতে আসে একটি চিত্রকর্ম। ছবিটির পেছনে লেখা শিল্পীর নাম দেখে সেটি মাত্র ৩০ ডলারে কিনে নেন তিনি। পরে সেই ছবিই নিলামে বিক্রি হয়েছে ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৬০০ ডলারে, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত শিল্পী গার্ট্রুড অ্যাবারক্রম্বির সাত দশকের বেশি সময় ধরে হারিয়ে থাকা চিত্রকর্মটির এমন আকাশছোঁয়া দাম এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
চিত্রকর্মটির নাম ‘অল্ডারম্যান মেরিয়ামস শেলস’। ১৯৫১ সালে আঁকা ছবিটি সম্প্রতি নিলাম প্রতিষ্ঠান ফ্রিম্যানের মাধ্যমে বিক্রি হয়। নিলামে ওঠার কিছুদিন আগেই একজন সংগ্রাহক এটি মাত্র ৩০ ডলারে কিনেছিলেন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকা।
‘অল্ডারম্যান মেরিয়ামস শেলস’ চিত্রকর্মটিতে গাঢ় সবুজ পটভূমির ওপর বিভিন্ন আকৃতির ঝিনুক ফুটিয়ে তুলেছেন অ্যাবারক্রম্বি। ছবির একটি অংশে কালচে আবহের মধ্যে ভাসমান অবস্থায় দেখা যায় একটি ঝিনুক।
শিল্পবিশ্লেষকদের মতে, ফাটলযুক্ত ঝিনুকের এই বিশেষ মোটিফ পরবর্তী সময়ে শিল্পীর একাধিক চিত্রকর্মেও দেখা গেছে। এটি তার স্বতন্ত্র শিল্পরীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত।
চিত্রকর্মটির ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৫২ সালে মিশিগানের কালামাজু শহরের চিকিৎসক ডক্টর জন টি. রেনল্ডসকে পারিশ্রমিক হিসেবে ছবিটি দেওয়া হয়েছিল। এর পরের বছর পর্যন্ত নিউইয়র্ক, শিকাগো, মিলওয়াকি ও ইভানস্টনের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল এটি।
কিন্তু এরপর চিত্রকর্মটি জনসমক্ষ থেকে হারিয়ে যায়। দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে এর অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি কালামাজু শহরের একটি এস্টেট সেলে পুরোনো ভিনাইল রেকর্ড খুঁজতে গিয়ে ছবিটির সন্ধান পান এক সংগ্রাহক। সেখানে পড়ে থাকা চিত্রকর্মটির পেছনে ‘অ্যাবারক্রম্বি’ নামটি লেখা দেখতে পান তিনি। নামটি দেখে ছবিটির সম্ভাব্য গুরুত্ব বুঝতে পেরে মাত্র ৩০ ডলারে সেটি কিনে নেন।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, চিত্রকর্মটি মূলত চিকিৎসক জন টি. রেনল্ডসের পরিবারের সম্পত্তির অংশ ছিল। তবে ছবিটির শিল্পমূল্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে পরিবারের সদস্যরা কতটা অবগত ছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সংগ্রাহকের কাছ থেকে চিত্রকর্মটি পৌঁছায় নিলাম প্রতিষ্ঠান ফ্রিম্যানের কাছে। নিলামের আগে শিকাগোর বমগার্টনার ফাইন আর্ট রেস্টোরেশনে সতর্কতার সঙ্গে ছবিটি সংস্কার করা হয়।
নিলামের আগে চিত্রকর্মটির সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৫ হাজার থেকে আড়াই লাখ ডলারের মধ্যে। কিন্তু সব পূর্বাভাস ছাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত এটি বিক্রি হয় ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৬০০ ডলারে। অর্থাৎ, নিলামে ছবিটির দাম নির্ধারিত সর্বোচ্চ প্রাক্কলনেরও বহুগুণ ছাড়িয়ে যায়।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিলামে এই প্রথম গার্ট্রুড অ্যাবারক্রম্বির কোনো চিত্রকর্মের দাম ১০ লাখ ডলার ছাড়াল।
গার্ট্রুড অ্যাবারক্রম্বি শিকাগোর শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছিলেন। শহরটির হাইড পার্ক এলাকায় বসবাসের পাশাপাশি সমকালীন জ্যাজ সংগীতের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ১৯৭৭ সালে মারা যান এই শিল্পী।
তার দীর্ঘদিন ধরে হারিয়ে থাকা চিত্রকর্মের পুনরাবিষ্কার এবং রেকর্ড দামে বিক্রি শিল্পীর কাজের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি দেখিয়েছে, পুরোনো কোনো শিল্পকর্মের প্রকৃত মূল্য অনেক সময় তার তাৎক্ষণিক বাজারদামের আড়ালে থেকে যেতে পারে।
মাত্র ৩০ ডলারে কেনা একটি ছবি যখন প্রায় ১৩ কোটি টাকায় বিক্রি হয়, তখন তা কেবল আর্থিক লাভের গল্প থাকে না; হয়ে ওঠে শিল্পের ইতিহাস, সংগ্রহ ও সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরার এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
