হলুদ-লাল কার্ডের বিকল্প ডিজিটাল প্রযুক্তি, ফুটবলে নতুন পরীক্ষা উরুগুয়েতে
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৪৫
ছবি সংগৃহিত
ফুটবলে রেফারির হলুদ ও লাল কার্ড দেখানোর প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রযুক্তির নতুন সংযোজন ঘটেছে। উরুগুয়ের একটি ম্যাচে খেলোয়াড়কে সতর্ক করতে কাগজের কার্ডের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে ফোনের মতো দেখতে একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস। পরীক্ষামূলক এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য, ম্যাচের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ এবং রেফারিদের প্রশাসনিক কাজ আরও সহজ করা।
ফুটবল মাঠে কোনো খেলোয়াড়কে সতর্ক করা কিংবা মাঠ থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানাতে এতদিন হলুদ ও লাল কার্ড ব্যবহার করে আসছেন রেফারিরা। তবে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন এক পরীক্ষায় সেই প্রচলিত পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে ডিজিটাল কার্ড।
বৃহস্পতিবার উরুগুয়ের কোপা উরুগুয়ে প্রতিযোগিতায় রেন্তিস্তাসের বিপক্ষে নাসিওনালের ম্যাচে পরীক্ষামূলকভাবে ডিভাইসটি ব্যবহার করেন রেফারি এদুয়ার্দো ভারেইয়া। খেলোয়াড়কে সতর্ক করতে তিনি প্রচলিত হলুদ কার্ডের পরিবর্তে ফোনের আকারের একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস তুলে ধরেন।
এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু কার্ড দেখানোর পদ্ধতি বদলানো নয়; বরং ম্যাচ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করা। নতুন ডিভাইসটির মাধ্যমে ম্যাচের বিভিন্ন ঘটনা সময়সহ ডিজিটালভাবে রেকর্ড করা যায়।
হাতে লেখা নথি থেকে ডিজিটাল রেকর্ড
প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান REFe। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাউরো সাকো শুক্রবার উরুগুয়ের রেডিও ‘এল এস্পেকতাদোর দেপোর্তেস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ফুটবলের যেসব ক্ষেত্রে এখনো প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, সেগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য।
বর্তমানে রেফারিরা সাধারণত ম্যাচে কার্ড দেখানোর পর সংশ্লিষ্ট তথ্য লিখে রাখেন। পরে সেই তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে সহজ করার চিন্তা থেকেই নতুন ডিভাইস তৈরির ধারণা আসে।
তিন বছরেরও বেশি সময় আগে সাকো ও তাঁর সহপরিচালক দিয়েগো দে লা পেনা বৃষ্টির মধ্যে একটি ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, রেফারিদের হাতে লেখা তথ্য সংরক্ষণ ও পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল সিস্টেমে স্থানান্তরের প্রয়োজন কমানো।
নতুন ডিভাইসটি ম্যাচের ঘটনা সময়ের উল্লেখসহ রেকর্ড করতে পারে। এর মাধ্যমে উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ‘COMET’ প্ল্যাটফর্মে আনুষ্ঠানিক ম্যাচ-রেকর্ড জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম পরীক্ষায় রেফারি ভারেইয়া ডিভাইসটির ব্যবহার নিয়ে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এটি ব্যবহার করা স্বাচ্ছন্দ্যকর এবং সফটওয়্যারও দ্রুত সাড়া দেয়। তবে প্রচলিত কার্ড দেখানোর যে নাটকীয়তা রয়েছে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে তা কিছুটা কমে যায়।
এদিকে পরীক্ষামূলক ব্যবহারে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে স্ক্রিনের দৃশ্যমানতা। এর আগে সূর্যের আলোয় স্ক্রিন স্পষ্ট দেখা না যাওয়ায় একটি পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছিল। সাম্প্রতিক ম্যাচেও গ্যালারির দর্শক ও টেলিভিশনে খেলা দেখা দর্শকদের কেউ কেউ রেফারির সিদ্ধান্ত বুঝতে সমস্যায় পড়েন।
প্রকল্পটির সহপরিচালক দিয়েগো দে লা পেনা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিটিকে আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মাঠে উপস্থিত দর্শক এবং টেলিভিশন দর্শক—উভয়ের কাছেই যেন কার্ডের রং স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
এ জন্য ডিভাইসটির চারপাশে এলইডি আলো যুক্ত করার মতো পরিবর্তন নিয়ে ভাবছেন উন্নয়নকারীরা। তাঁদের লক্ষ্য, হলুদ ও লাল কার্ডের প্রচলিত রং যেন ডিজিটাল মাধ্যমেও সহজে শনাক্ত করা যায়।
নতুন প্রযুক্তিটি অনলাইনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। কেউ উদ্যোগটিকে ফুটবলের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ প্রচলিত কার্ডের বিকল্প হিসেবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে সমালোচনা ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া-দুটিকেই উদ্ভাবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখছেন সাকো। তাঁর মতে, নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ডিভাইসটির ব্র্যান্ড নিবন্ধন করা হয়েছে এবং হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের পেটেন্ট নেওয়া হয়েছে। এর উন্নয়নকাজে চীনের ডেভেলপাররা যুক্ত রয়েছেন।
প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা ও দৃশ্যমানতার সমস্যাগুলো সমাধান করে ভবিষ্যতে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার স্বীকৃতি পাওয়ার আশা করছে REFe। তবে এখনো এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে; প্রচলিত হলুদ ও লাল কার্ডের জায়গায় আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহারের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
