ওসমানী হাসপাতালে সাংবাদিকদের পিটিয়ে কর্মবিরতিতে ইন্টার্নরা: জিম্মি রোগী
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০৫
সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের মারধরের ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও ছবি তুলতে গিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হামলায় আহত হয়েছেন দুই সাংবাদিক। তাঁদের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে এবং সেলাই দিতে হয়েছে। এ ঘটনার পর হামলার শিকার সাংবাদিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থা না করেই কর্মবিরতি শুরু করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। এতে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
আহত দুই সাংবাদিক হলেন দৈনিক শ্যামল সিলেটের ফটোসাংবাদিক রেজা রুবেল ও সিলেটভিউ২৪ ডটকমের স্টাফ রিপোর্টার নিবেন্দু তালুকদার।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাত পৌনে ১০টার দিকে হাসপাতালের পঞ্চম তলায় অপারেশন থিয়েটারের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে রোগীর স্বজনদের মারধরের ঘটনা ঘটে। পরে অপারেশন থিয়েটারের সামনে আরেক রোগীর স্বজনদের মারধর করা হয়। এ ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও ছবি তুলতে গেলে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা দুই সাংবাদিকের ওপর হামলা করেন। এ সময় স্যালাইনের স্ট্যান্ড দিয়ে তাঁদের মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তাঁরা রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে যান।
অভিযোগ রয়েছে, গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে চাইলেও তাঁদের ভর্তি করা হয়নি। পরে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কর্মবিরতি শুরু করেন। এ সময় তাঁদের কয়েকজনকে লাঠিসোঁটা হাতে হাসপাতালের ভেতরে ও ফটকে অবস্থান করতে দেখা যায়। রোগীর স্বজনদেরও মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
কর্মবিরতির কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ায় রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা বিপাকে পড়েন। কেউ কেউ চিকিৎসা না পেয়ে রোগী নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান।
এদিকে সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বুধবার গভীর রাতে নগরের চৌহাট্টা পয়েন্টে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন সাংবাদিকেরা। এ সময় হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ দিদার আলম চৌধুরী নোবেলের সভাপতিত্বে এবং মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাসুদ আহমদ রণির পরিচালনায় কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনিস রহমান, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক কোষাধ্যক্ষ মাহমুদ হোসেন, বাংলাদেশ মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিদ হোসেনসহ সাংবাদিক নেতারা।
বক্তারা বলেন, দুই সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন। তাঁদের মাথায় আঘাত লেগেছে এবং সেলাই দিতে হয়েছে। এ ঘটনায় সিলেটে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। হাসপাতালটিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনার অবসান হওয়া প্রয়োজন।
তাঁরা বলেন, সাংবাদিকেরা মানুষের ভোগান্তি ও অনিয়মের তথ্য তুলে ধরতে সংবাদ সংগ্রহ করেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তাঁদের ওপর হামলার কোনো যৌক্তিকতা নেই। রোগীর স্বজনদের মারধরের অভিযোগেরও সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মবিরতির কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার বিষয়েও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সাংবাদিক নেতারা ঘোষণা দেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিলেটের সব সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা বৈঠক করে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করবেন। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র প্রকাশেরও দাবি জানান তাঁরা। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সাংবাদিকদের নিরাপদে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন নেতারা।
এদিকে ঘটনার পর হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চিকিৎসক আবু জাফর মো. খালেদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
হাসপাতালের উপপরিচালক চিকিৎসক বদরুল আলম বলেন, তাঁরা ঘটনাটি জেনেছেন। পরিস্থিতি নিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি বলেন, সাংবাদিকেরা সেখানে মারামারি করতে যাননি, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন। তাঁদের ওপর হামলা করা ঠিক হয়নি। বিষয়টি তাঁরা দেখছেন।
