সুনামগঞ্জে ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৪১
ছবি: সংগৃহীত
সুনামগঞ্জে ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত’ ছাত্রলীগের এক নেতাকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। শাহনেওয়াজ চৌধুরী প্রিন্স (১৯) নামের ওই নেতাকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, থানায় নেওয়ার পর পুলিশের নির্যাতনে তিনি সংজ্ঞা হারান। তবে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশ বলছে, পুরোনো খিচুনির রোগের কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত ১২টার দিকে সুনামগঞ্জ শহরের নতুনপাড়া আবাসিক এলাকার বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে সদর মডেল থানা পুলিশ। গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন শেখ।
শাহনেওয়াজ চৌধুরী প্রিন্স সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বলে জানা গেছে। তিনি শহরের তেঘরিয়া গ্রামের শাহরুখ রাজা চৌধুরীর ছেলে। এ বছর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন তিনি।
পরিবারের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাকারিয়ার নেতৃত্বে একদল পুলিশ নতুনপাড়ার বাসায় যায়। ওসি রতন শেখের সঙ্গে দেখা করানোর কথা বলে তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাত দেড়টার দিকে পরিচিত একজনের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, প্রিন্স অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে পড়ে আছেন।
খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে যান। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা না হওয়ায় পরে নগরের সুবিদবাজার এলাকার কুইন্স প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
প্রিন্সের বাবা শাহরুখ রাজা চৌধুরী বলেন, তাঁর ছেলে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। এর আগে একটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর কারাগারে থেকেই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। বর্তমানে জামিনে থাকা অবস্থায় বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে পাওয়া যায়।
ছেলে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আমার ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।’
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে গ্রেপ্তারের আগে পুলিশ ও শাহনেওয়াজের কথোপকথন শোনা যায়। সেখানে তাঁকে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার, আমি কয়দিন পর আত্মসমর্পণ করব।’ জবাবে এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘বোকা ছেলের মতো কথা বলো। দুদিন পরে তুমি পাশ করলে আমরা মিষ্টি খাওয়াবো, সমস্যা নাই।’ নিজের ক্যারিয়ার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা জানালে ওই পুলিশ সদস্য বলেন, ‘ক্যারিয়ার তো এমনিতেই নাই। ক্যারিয়ার তো শেষ হয়ে গেছে।’
তবে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওসি রতন শেখ। তিনি বলেন, শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে। মামলার আসামি হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর শরীর খুব দুর্বল এবং পুরোনো খিচুনির রোগ রয়েছে। রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে তাঁকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসক তাঁকে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। তবে তাঁর পরিবার তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছে। তিনি পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার রাতে সুনামগঞ্জে এ অভিযোগ ওঠার দিনই সিলেটের একটি আদালত পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে রায়হান আহমদের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ‘আটক অবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করার অধিকার পুলিশ কিংবা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই। কোনো ব্যক্তি দুর্ধর্ষ অপরাধী হলেও বিচার ছাড়া তাঁকে শাস্তি দেওয়ার অধিকারও কারও নেই।’ আদালত আরও বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেই আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা হয়।
