https://www.emjanews.com/

20191

entertainment

প্রকাশিত

০১ নভেম্বর ২০২৬ ০৯:৩৫

বিনোদন

হ্যালোইন উৎসব কী?

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ ০৯:৩৫

ছবি: সংগৃহীত

৩১ অক্টোবর রাত। চারদিকে অন্ধকার। কোথাও জ্বলছে আগুন, কোথাও মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষ। বাড়ির সামনে সাজানো ভয়ংকর মুখের কুমড়া, আর শিশুদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে ‘ট্রিক অর ট্রিট’। দেখতে উৎসবের মতো হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে মৃত্যু, আত্মা ও পরলোক নিয়ে হাজার বছরের পুরোনো এক গল্প।

কল্পনা করুন, প্রায় দুই হাজার বছর আগের এক অন্ধকার রাত। চারদিকে শীতের আগমনী বার্তা। ফসল কাটার মৌসুম শেষ হয়েছে। দীর্ঘ শীতের প্রস্তুতি নিচ্ছে মানুষ। এমন এক সময়ে প্রাচীন কেল্টিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ছিল এক বিশেষ বিশ্বাস। বছরের শেষ রাতে নাকি জীবিত ও মৃতদের জগতের মধ্যকার সীমারেখা মুছে যায়। মৃত মানুষের আত্মারা ফিরে আসে পৃথিবীতে। তাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় নানা অতিপ্রাকৃত শক্তিও।

এই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয়েছিল এক বিশেষ আয়োজন। বড় বড় আগুন জ্বালাতেন মানুষ। কেউ পশুর চামড়া, কেউবা অদ্ভুত মুখোশ পরে নিজেদের চেহারা বদলে ফেলতেন। উদ্দেশ্য একটাই; ফিরে আসা আত্মা কিংবা অশুভ শক্তির হাত থেকে নিজেদের আড়াল করা। প্রাচীন সেই উৎসবের নাম ছিল ‘সাওইন’। আর সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আজকের হ্যালোইন।

প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয় এই উৎসব। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শপিংমল কিংবা পার্টির জায়গা সাজানো হয় ভূত, প্রেত, কঙ্কাল, ডাইনি ও ভ্যাম্পায়ারের আদলে। কেউ ভয়ংকর পোশাক পরেন, কেউ মুখে রক্তের দাগ আঁকেন। আবার বাড়ির সামনে রাখা হয় কৃত্রিম কবর, ভূতের মূর্তি ও আলো জ্বলা কুমড়া। কিন্তু যে উৎসব আজ আনন্দ ও বিনোদনের উপলক্ষ, তার শুরুটা ছিল অনেকটাই ভিন্ন।

সাওইন থেকে হ্যালোইন, নাম বদলের গল্প
হ্যালোইনের ইতিহাসের শিকড় প্রাচীন কেল্টিক জনগোষ্ঠীর সাওইন উৎসবে। বর্তমান আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও উত্তর ফ্রান্সের কিছু অঞ্চলে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠী ১ নভেম্বর নববর্ষ উদযাপন করত। দিনটি ছিল গ্রীষ্মের বিদায় এবং শীতের আগমনের প্রতীক।

তাদের বিশ্বাস ছিল, ৩১ অক্টোবর বছরের শেষ রাতে মৃতদের আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। তাই আত্মাদের সন্তুষ্ট করতে খাবার ও পানীয় উৎসর্গ করা হতো। একই সঙ্গে অশুভ শক্তি থেকে বাঁচতে আয়োজন করা হতো আগুন জ্বালানোর অনুষ্ঠান।

পরবর্তী সময়ে রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাবে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে রোমানদের কিছু উৎসবের ঐতিহ্য মিশে যায়। এরপর ইউরোপে খ্রিষ্টধর্মের প্রসারের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন ধর্মীয় রীতি।

খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারে ১ নভেম্বর পালিত হতে শুরু করে ‘অল সেইন্টস ডে’ বা সব সন্তের স্মরণ দিবস। এর আগের সন্ধ্যার নাম ছিল ‘অল হ্যালোজ ইভ’। সময়ের সঙ্গে এই নাম সংক্ষিপ্ত হয়ে পরিচিতি পায় ‘হ্যালোইন’ নামে।

এরপর ২ নভেম্বর পালিত হতে শুরু করে ‘অল সোলস ডে’। এদিন সাধারণ মৃত মানুষের আত্মার শান্তি কামনা করা হতো। এভাবেই ৩১ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত সময়টি মৃতদের স্মরণ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে।

অন্ধকারে জ্বলে ওঠা কুমড়ার মুখ, জ্যাক-ও-ল্যান্টার্নের কাহিনি
হ্যালোইনের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভয়ংকর মুখ খোদাই করা একটি কুমড়া। ভেতরে রাখা মোমবাতি বা আলোয় অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে তার চোখ ও মুখ। এর নাম ‘জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন’।

তবে এই ঐতিহ্যের শুরু কুমড়া দিয়ে হয়নি। আয়ারল্যান্ডে একসময় শালগম, আলু কিংবা অন্যান্য সবজি কেটে তৈরি করা হতো এমন ভয়ংকর মুখ।

এর পেছনে রয়েছে স্টিঞ্জি জ্যাক নামের এক ব্যক্তিকে ঘিরে প্রচলিত লোককাহিনি। কথিত আছে, জ্যাক শয়তানকে একাধিকবার ধোঁকা দিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর স্বর্গ কিংবা নরক-কোথাও তার জায়গা হয়নি। হাতে জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে তাকে অন্ধকার পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতে হয়। সেই গল্প থেকেই জ্বলন্ত আলোসহ খোদাই করা সবজির নাম হয় জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন।

পরে আইরিশ অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে এই ঐতিহ্য নিয়ে যান। সেখানে শালগমের পরিবর্তে বড় আকারের কুমড়া ব্যবহার শুরু হয়। কুমড়া সহজে খোদাই করা যায় এবং এর ভেতরে আলো রাখাও সুবিধাজনক। ধীরে ধীরে কুমড়াই হয়ে ওঠে হ্যালোইনের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর একটি।

দরজায় দরজায় শিশুদের মিষ্টি চাওয়ার গল্প
হ্যালোইনের আরেকটি জনপ্রিয় আয়োজন ‘ট্রিক অর ট্রিট’। এদিন শিশুরা ভূত, ডাইনি, সুপারহিরো কিংবা নানা কাল্পনিক চরিত্রের পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়িতে যায়। দরজায় কড়া নেড়ে মিষ্টি বা চকলেট চায়। মিষ্টি না দিলে মজা করে দুষ্টুমি করার হুমকি দেয়।

কিন্তু এই আনন্দময় প্রথার পেছনেও রয়েছে পুরোনো এক ধর্মীয় ঐতিহ্য। মধ্যযুগে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে অল সোলস ডে উপলক্ষে দরিদ্র মানুষেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘সোল কেক’ নামের বিশেষ খাবার চাইতেন। বিনিময়ে বাড়ির প্রয়াত স্বজনদের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করতেন।

সময়ের সঙ্গে এই প্রথায় পরিবর্তন আসে। শিশুদের মধ্যেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার সংগ্রহের রীতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে আইরিশ ও স্কটিশ অভিবাসীদের মাধ্যমে তা যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটিতে ‘ট্রিক অর ট্রিট’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

একেক দেশে একেক রকম আয়োজন
সময়ের সঙ্গে হ্যালোইন ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয় এই উৎসব। বাড়িঘর সাজানো, কুমড়া খোদাই, শিশুদের ট্রিক অর ট্রিট, ভয়ংকর পোশাকের প্রতিযোগিতা ও বিশেষ পার্টির আয়োজন থাকে দিনটিকে ঘিরে।

আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে এখনো হ্যালোইনের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের প্রভাব দেখা যায়। সেখানে আগুন জ্বালানো, মুখোশ পরা ও বিভিন্ন লোকজ খেলার আয়োজন করা হয়। যুক্তরাজ্যেও শিশু-কিশোরদের মধ্যে উৎসবটি বেশ জনপ্রিয়।

অন্যদিকে মেক্সিকোতে ১ ও ২ নভেম্বর পালিত হয় ‘ডে অব দ্য ডেড’ বা মৃতদের স্মরণে উৎসব। এ সময় পরিবারের সদস্যরা প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ করেন। কবর সাজান, প্রিয় খাবার রাখেন এবং রঙিন কঙ্কালের সাজে উৎসবে অংশ নেন। তবে ডে অব দ্য ডেড ও হ্যালোইন সম্পূর্ণ আলাদা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উৎসব।

আত্মার ভয় থেকে আনন্দের উৎসব
যে উৎসবের শুরু হয়েছিল আত্মা, মৃত্যু ও অশুভ শক্তিকে ঘিরে নানা বিশ্বাস থেকে, সময়ের সঙ্গে তার রূপ বদলে গেছে। এখন হ্যালোইন অনেকটাই আনন্দ, বিনোদন ও বাণিজ্যিক আয়োজনের অংশ। পোশাক, মুখোশ, কুমড়ার সাজসজ্জা, মিষ্টি, খেলনা ও সিনেমাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বড় বাজার।

তবে উৎসবটির ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, হ্যালোইন কেবল ভয়ংকর পোশাক পরে আনন্দ করার দিন নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে প্রাচীন কেল্টিকদের ঋতু পরিবর্তনের বিশ্বাস, মৃতদের স্মরণ, ইউরোপের ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং অভিবাসীদের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়া নানা সংস্কৃতি।

অর্থাৎ অন্ধকার রাতে আত্মাদের ফিরে আসার যে প্রাচীন বিশ্বাস থেকে এই উৎসবের যাত্রা, হাজার বছরের বিবর্তনে তা আজ পরিণত হয়েছে আলো, সাজসজ্জা ও আনন্দের এক বিশ্বজনীন আয়োজনে।