রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থী ভিসা নীতিতে পরিবর্তনের আভাস!
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ ০৯:৫৩
ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তিতে কঠোর বিধিনিষেধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়ার উচ্চশিক্ষা খাতে। ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বৃদ্ধি এবং নতুন শিক্ষার্থী আবেদনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আগামী তিন বছরে দেশটির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায় ২০০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার রাজস্ব হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য এই আর্থিক ক্ষতি ও উচ্চশিক্ষা খাতের ওপর চাপ বিবেচনায় নিয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা নীতি এবং আর্থিক মূল্যায়নের শর্তে পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির সরকার।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য অস্ট্রেলিয়া। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণার সুযোগ এবং পড়াশোনা শেষে কর্মজীবন গড়ার সম্ভাবনার কারণে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী দেশটিতে পাড়ি জমান। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছেও অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরে আকর্ষণীয় গন্তব্য।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে দেশটির কঠোর নীতিমালা উচ্চশিক্ষা খাতে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়ে যাওয়া এবং নতুন আবেদন কমে আসায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও সম্ভাব্য আয় নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আগামী তিন বছরে অস্ট্রেলিয়ার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায় ২ বিলিয়ন বা ২০০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার রাজস্ব হারাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
কেন কঠোর করা হয়েছিল শিক্ষার্থী ভিসা নীতি?
অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাসন সংকট, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা এবং ভিসার অপব্যবহার নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয় দেশটির সরকার।
ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং প্রকৃত শিক্ষার্থী হিসেবে আবেদনকারীর যোগ্যতা যাচাইয়ের বিষয়গুলোতে কঠোরতা আনা হয়। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই শুরু হয়।
সরকারের এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থী ভিসার অপব্যবহার কমানো, অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং প্রকৃত শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া।
তবে কঠোর নীতির প্রভাব আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির ওপর পড়তে শুরু করেছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন উচ্চশিক্ষা খাতের সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজস্বে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি। স্থানীয় শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি শিক্ষার্থীরা বেশি টিউশন ফি দিয়ে থাকেন। ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়েও সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বৃদ্ধি এবং নতুন আবেদনের সংখ্যা সংকুচিত হওয়ার কারণে আগামী তিন বছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায় ২০০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ ধরনের আর্থিক চাপ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রম, নতুন শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার মান বজায় রাখার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর নির্ভরশীল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত সরকারের
উচ্চশিক্ষা খাতে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভিসা নীতিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনের ইঙ্গিত দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার।
আর্থিক মূল্যায়নের শর্ত এবং শিক্ষার্থী ভিসা প্রক্রিয়ায় কিছুটা নমনীয়তা আনার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত ও যোগ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর আর্থিক চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ঠিক কোন কোন নিয়ম পরিবর্তন করা হবে, কবে থেকে নতুন নীতিমালা কার্যকর হবে এবং কোন দেশগুলোর শিক্ষার্থীরা এর মাধ্যমে বেশি সুবিধা পাবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
নীতি সংস্কারের দাবি শিক্ষাবিদদের
অস্ট্রেলিয়ার উচ্চশিক্ষা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংস্থাগুলো দ্রুত নীতি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, শিক্ষার্থী ভিসার ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত বিধিনিষেধের কারণে প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেন সুযোগ হারিয়ে না ফেলেন, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের উৎস নন; তারা অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাই শিক্ষার্থী ভিসা নীতিতে এমন ভারসাম্য প্রয়োজন, যাতে একদিকে অভিবাসন ব্যবস্থাপনা কার্যকর থাকে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার পরিবেশ ও সুনাম অক্ষুণ্ণ থাকে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কী বার্তা?
অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করছেন এমন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভিসা নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন হলে ভবিষ্যতে আবেদন প্রক্রিয়া, আর্থিক সক্ষমতার মূল্যায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে কিছু সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে নীতিমালায় আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত আগের নিয়ম অনুযায়ীই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন, টিউশন ফি, জীবনযাত্রার ব্যয়, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক নথিপত্র প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভিসা নীতির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ-একদিকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সুনাম বজায় রাখা। আগামী দিনে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদেশে পড়তে আগ্রহী লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
