জুয়ার টাকা জোগাতে স্বজন-বন্ধুর পরিচয় চুরি, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশির জেল
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:৫১
আতিকুর রহমান
যুক্তরাজ্যে জুয়ার নেশার টাকা জোগাতে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের ব্যক্তিগত পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি কল্যাণ তহবিলের ১ লাখ ৭২ হাজার পাউন্ড (প্রায় সোয়া ২ কোটি টাকা) আত্মসাতের দায়ে আতিকুর রহমান (৩৪) নামের এক বাংলাদেশিকে ৪০ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আট বছরের জন্য কোনো কোম্পানির পরিচালক হওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাকে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দেশটির ক্যান্টারবেরি ক্রাউন কোর্ট এ রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত আতিকুর কেন্টের মারগেট এলাকার বাসিন্দা। তিনি পেশায় একজন ডেলিভারি চালক।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে এ জালিয়াতি করেন আতিকুর। নিজের জুয়ার নেশার খরচ মেটাতে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে ২৬ জনের ব্যক্তিগত নথিপত্র ও পরিচয় চুরি করেন তিনি।
সরকারি ভাতা পেতে ভুয়া কোম্পানি, চাকরির জাল নথি এবং অস্তিত্বহীন সন্তানের তথ্য ব্যবহার করে ৪০টির বেশি আবেদন জমা দেন আতিকুর। পরিচিতদের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাঁদের কাছ থেকে সংবেদনশীল কাগজপত্র সংগ্রহ করতেন। পরে সেসব তথ্য ব্যবহার করে দেশটির ওয়ার্ক অ্যান্ড পেনশন বিভাগ (ডিডব্লিউপি) এবং রাজস্ব ও শুল্ক বিভাগের (এইচএমআরসি) বিভিন্ন ভাতার জন্য আবেদন করতেন।
এসব জালিয়াতির মাধ্যমে ইউনিভার্সাল ক্রেডিট, মাতৃত্বকালীন ভাতা, চাইল্ড বেনিফিট ও ওয়ার্কিং ট্যাক্স ক্রেডিটের অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি। তবে যাঁদের পরিচয় ব্যবহার করে এসব ভাতা তোলা হচ্ছিল, তাঁরা বিষয়টি জানতেন না।
২০১৮ সালে ভুক্তভোগীদের একজন বৈধভাবে সরকারি ভাতার আবেদন করতে গেলে প্রথম জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসে। ডিডব্লিউপির কর্মকর্তারা তাঁর ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স রেকর্ডে অসংগতি খুঁজে পেয়ে বিষয়টি তদন্তে পাঠান। পরে ব্যাংক হিসাব যাচাই করে দেখা যায়, বিভিন্ন ব্যক্তির নামে তোলা ভাতার অর্থ আতিকুরের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংক হিসাবে জমা হচ্ছে।
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় অর্থের চাহিদা বাড়লে আতিকুর সরকারি ব্যবসায়িক প্রণোদনা তহবিল থেকেও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তৎকালীন চ্যান্সেলর ঋষি সুনাক ঘোষিত ‘ইট আউট টু হেল্প আউট’ প্রকল্পের আওতায় ২০টি ভুয়া রেস্তোরাঁর নিবন্ধন জমা দেন তিনি।
এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি কোষাগার থেকে ৬২ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ নেওয়ার চেষ্টা করেন আতিকুর। তবে এইচএমআরসির স্বয়ংক্রিয় জালিয়াতি প্রতিরোধ ব্যবস্থায় আবেদনগুলো সন্দেহজনক হিসেবে শনাক্ত হওয়ায় অর্থ ছাড়ের আগেই তা আটকে দেওয়া হয়।
ডিডব্লিউপির সঙ্গে যৌথ তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২১ সালের অক্টোবরে আতিকুরের মারগেটের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এইচএমআরসির ফ্রড ইনভেস্টিগেশন সার্ভিস। জিজ্ঞাসাবাদে ভুয়া রেস্তোরাঁ নিবন্ধনের বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি। দীর্ঘ ফরেনসিক হিসাব নিরীক্ষার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার পাঁচটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়। পরে আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করেন আতিকুর।
এইচএমআরসির ফ্রড ইনভেস্টিগেশন সার্ভিসের উপপরিচালক মার্গারেট মাউসলি জানান, অর্থ ছাড়ের আগে যাচাই-বাছাইয়ের কারণে আতিকুরের জালিয়াতির চেষ্টা থেকে সরকারি কোষাগারের ৬০ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ রক্ষা পেয়েছে।
দেশটির উদ্ভাবন, জালিয়াতি ও তথ্যবিষয়ক মন্ত্রী লিলিয়ান গ্রিনউড আতিকুরের কর্মকাণ্ডকে বন্ধু ও স্বজনদের সঙ্গে ‘পরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, অপরাধমূলক প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা প্রতিটি পাউন্ড জরুরি জনসেবা ও প্রকৃত সুবিধাভোগীদের ন্যায্য তহবিল থেকে বঞ্চিত করে। তাঁর সরকার এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বড় জালিয়াতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
