https://www.emjanews.com/

20194

international

প্রকাশিত

০১ নভেম্বর ২০২৬ ১০:০২

আন্তর্জাতিক

পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি ছাড়ার পথে ইরান!

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ ১০:০২

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অপ্রসার চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে আসার দাবি জোরালো হচ্ছে ইরানে। দেশটির পার্লামেন্টে চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের পক্ষে ১০টি প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন এক সংসদ সদস্য। একই সঙ্গে ইরানের পরমাণু নীতিতেও পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন প্রভাবশালী রাজনীতিকরা। তবে এখনো চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়নি তেহরান।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সংঘাত, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে বিরোধের মধ্যে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের দাবি উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি’ বা এনপিটি থেকে ইরানের প্রত্যাহারের দাবি জোরালো হচ্ছে।

আল জাজিরার ৩১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিশনের সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি জানিয়েছেন, এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে ১০টি প্রস্তাব পার্লামেন্টে নিবন্ধিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা চলছে।

অন্যদিকে সংসদ সদস্য মাহমুদ নবাভিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে দেশের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন।

কেন এনপিটি ছাড়তে চাইছে ইরানের রাজনীতিকরা?
ইরানের রাজনীতিকদের একাংশের অভিযোগ, দেশটি আন্তর্জাতিক চুক্তির সদস্য হয়েও তার অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। বরং পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ এবং সামরিক হামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তেহরানকে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর ইরানের কট্টরপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

সংসদ সদস্য মাহমুদ নবাভিয়ান ৩১ অক্টোবর দেওয়া বক্তব্যে বলেন, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার বড় মূল্য দেওয়ার পর এখন এনপিটি থেকে বেরিয়ে এসে পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের সময় এসেছে।

তাদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক চুক্তির সদস্য থাকার পরও যদি দেশের পারমাণবিক স্থাপনা সামরিক হামলার ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে ওই চুক্তিতে থাকার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বিবেচনা করা উচিত।

তবে এটি ইরানের সব রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভিন্ন অবস্থান নয়। চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের বিষয়টি এখনো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিতর্কের মধ্যে রয়েছে।

পার্লামেন্টে ১০টি প্রস্তাব, কী হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ?
ইরানের পার্লামেন্টে এনপিটি থেকে প্রত্যাহারের বিষয়ে একাধিক প্রস্তাব নিবন্ধিত হওয়ার খবর দেশটির পারমাণবিক নীতি নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রত্যাহারের পক্ষে ১০টি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।

এর আগে সেপ্টেম্বরেও কয়েকজন সংসদ সদস্য দ্রুততার সঙ্গে চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের প্রস্তাব আলোচনায় আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

তবে একাধিক প্রস্তাব নিবন্ধিত হওয়া মানেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গেছে, এমন নয়। এসব প্রস্তাবের আলোচনা, সংসদীয় অনুমোদন এবং পরবর্তী সাংবিধানিক ও সরকারি প্রক্রিয়া এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে রয়েছে।

এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার আইনি সুযোগ কী?
১৯৭০ সালে এনপিটিতে যোগ দেয় ইরান। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে সহযোগিতা বাড়ানো।

চুক্তির দশম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সদস্যরাষ্ট্র যদি মনে করে চুক্তিসংশ্লিষ্ট অসাধারণ পরিস্থিতি তার দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থকে বিপন্ন করেছে, তাহলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশকে তিন মাস আগে অন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলো এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করতে হয়। একই সঙ্গে প্রত্যাহারের কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়।

অর্থাৎ ইরানের জন্য এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার আইনি পথ রয়েছে। তবে এর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিণতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে বিরোধ
ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বিরোধও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিভিন্ন দিক, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এবং পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে।

আইএইএ ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে তেহরানের অভিযোগ, সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করতে পারছে না।

গত সেপ্টেম্বর আইএইএর বোর্ড অব গভর্নরস ইরানের বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রতিবেদন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও দুই পক্ষের বিরোধ আরও গভীর হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ইরানের সংসদ সদস্যদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এনপিটিতে থাকা দেশের নিরাপত্তা ও পারমাণবিক স্বার্থ রক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়।

এনপিটি ছাড়লেই কি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে ইরান?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার অর্থ এই নয় যে কোনো দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে।

চুক্তি থেকে প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ দুটি আলাদা বিষয়। তবে কোনো দেশ এনপিটির সদস্যপদ ছেড়ে দিলে তার পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি ও সহযোগিতার কাঠামো জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার হুমকিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষির কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।

অন্যদিকে প্রকৃতপক্ষে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ বাড়বে এবং নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

উল্লেখ্য, ইরান সরকার অতীতে একাধিকবার জানিয়েছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির লক্ষ্য অনুসরণ করছে না।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
ইরান যদি সত্যিই এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ফলে চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের উদ্যোগ আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক পরমাণু পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বিশ্ব
ইরানের পার্লামেন্টে এনপিটি থেকে প্রত্যাহারের পক্ষে ১০টি প্রস্তাব নিবন্ধিত হওয়ার ঘটনা দেশটির পরমাণু নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়নি।

একদিকে সামরিক নিরাপত্তা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি-এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে তেহরানকে।

ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, পার্লামেন্টের প্রস্তাবগুলো কত দূর এগোবে এবং শেষ পর্যন্ত দেশটির নেতৃত্ব এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেবে কি না, তা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।