ছবি: সংগৃহীত
সিয়াম সাধনার দীর্ঘ এক মাস শেষে যখন ঈদের চাঁদ আকাশে ধরা দেয়, তখন পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ, ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের অনন্য এক বার্তা। সেই আনন্দের ঢেউ এসে লাগে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মনেও। তবুও এই রঙিন উৎসবের আড়ালে নীরবে জমে থাকে অজস্র না বলা গল্প, বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস আর প্রিয়জনদের জন্য এক অদৃশ্য টান।
মালয়েশিয়ার ব্যস্ত শহরগুলো বিশেষ করে কুয়ালালামপুর ঈদের সকালে যেন অন্য এক রূপ নেয়। নতুন পোশাকে সেজে প্রবাসীরা ছুটে যান ঈদের নামাজে। নামাজ শেষে কোলাকুলি, শুভেচ্ছা বিনিময় সব মিলিয়ে মুহূর্তগুলোয় গড়ে ওঠে এক টুকরো বাংলাদেশ। ক্ষণিকের জন্য ভুলে যান দূরত্ব, ভুলে যান একাকিত্ব।

কিন্তু এই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর এক শূন্যতা। কারও বাবা আর নেই, কারও মা হারিয়ে গেছেন না ফেরার দেশে, কেউবা হারিয়েছেন প্রিয় ভাই-বোন। অথচ শেষবারের মতো মুখ দেখা হয়নি, জানাজার সময় পাশে দাঁড়ানো হয়নি, একমুঠো মাটি দেওয়াও হয়নি। এই না-পারার বেদনা প্রবাস জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য।
নির্মাণ শ্রমিক রফিকুল ইসলামের কণ্ঠে সেই বেদনার ভার স্পষ্ট। বাবা মারা গেলেন, আমি যেতে পারলাম না। ভিডিও কলে জানাজা দেখেছি… নিজের বাবার কবরে মাটি দিতে পারিনি। এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে? ঈদ এলে সবকিছু আবার মনে পড়ে।
রেস্টুরেন্ট কর্মী শরিফ মিয়ার চোখেও একই হাহাকার। মা অসুস্থ ছিলেন, পরে চলে গেলেন। ছুটি পাইনি… আজও মনে হয়, একবার যদি মায়ের হাতটা ধরতে পারতাম! ঈদের দিনে সবাই খুশি থাকে, আর আমার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়।
তবুও জীবন থেমে থাকে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ, দায়িত্ব আর টিকে থাকার লড়াই চলতেই থাকে। ঈদের দিনটুকুতে একটু সময় বের করে ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন তারা। পর্দার ওপাশে হাসিমুখ, এপাশে নীরব চোখের জল স্পর্শহীন ভালোবাসা যেন আরও বেশি কষ্ট দেয়।

অন্যদিকে কিছু প্রবাসী চেষ্টা করেন একাকিত্ব ভাঙতে। মালয়েশিয়ায় কর্মরত তথ্য প্রযুক্তি পেশাজীবী পাভেল সারওয়ার বলেন, আমরা চেষ্টা করি একসঙ্গে রান্না করে খেতে, গান গাইতে, ছবি তুলতে। এতে করে একাকিত্বটা কিছুটা কমে যায়। কিন্তু ভেতরের শূন্যতা পুরোপুরি যায় না।
দেশে থাকা পরিবারগুলোর অবস্থাও ভিন্ন নয়। কুমিল্লার গৃহিণী নাজমা বেগম বলেন, ঈদে স্বামী পাশে না থাকলে আনন্দ পূর্ণ হয় না। বাচ্চারা নতুন জামা পরে, কিন্তু বারবার বাবাকে খোঁজে… তখন কিছু বলার থাকে না।
রফিকুল ইসলামের মা নীরবে বলেন, ছেলেটা কষ্ট করে টাকা পাঠায়, তাই কিছু বলি না। কিন্তু ঈদের দিন ঘরটা ফাঁকা লাগে… খুব ফাঁকা।
শিশুদের ঈদও যেন অপূর্ণ। ভিডিও কলে বাবাকে দেখে তারা হাসে, হাত নাড়ায়, কিন্তু সেই হাসিতে নেই ছোঁয়ার উষ্ণতা। তবুও এই ভার্চুয়াল মুহূর্তই তাদের ঈদের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।
মালয়েশিয়ায় অতিরিক্ত ছুটির ঘোষণা অনেকের মনে আনন্দ বাড়ালেও, অবৈধ প্রবাসীদের জন্য ঈদ যেন ভয় আর অনিশ্চয়তার। ঈদের আনন্দের মাঝেই চলে তল্লাশি, আতঙ্ক আর লুকিয়ে থাকার জীবন।
তবুও বিকেল গড়ালে পার্ক, লেক আর পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভিড় জমে প্রবাসীদের। কেউ ছবি তোলে, কেউ গল্প করে, কেউ চুপচাপ বসে থাকে। হয়তো মনে মনে ফিরে যায় দূরের সেই বাড়িতে, যেখানে অপেক্ষা করে আছে প্রিয় মুখগুলো অথবা এমন কিছু স্মৃতি, যাদের কাছে আর কোনোদিন ফেরা হবে না।
এই মিলনমেলাগুলো শুধু আনন্দের নয়, বরং ভাগাভাগিরও দুঃখের, কষ্টের, আশার। এখানে কেউ নতুন কাজের কথা বলে, কেউ দেশের খবর আনে, কেউ শুধু একটু হাসির জন্য বন্ধুর কাঁধে মাথা রাখে।
প্রবাসে ঈদ মানে শুধু উৎসব নয় এ এক দায়িত্ব, এক ত্যাগের গল্প। অনেকেই ঈদের দিনও কাজ করেন, যাতে পরিবারের জন্য আরও কিছু পাঠাতে পারেন। এই নিঃশব্দ ত্যাগের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তাদের গভীর ভালোবাসা, আর সেই ভালোবাসার ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকে অশ্রুর দাগ।
তবুও ঈদ আসে আনন্দ নিয়ে, আশার আলো নিয়ে।
প্রবাসীর চোখ ভিজে থাকলেও ঠোঁটে থাকে হাসি। কারণ তারা জানেন, তাদের এই ত্যাগই একদিন পরিবারকে এনে দেবে স্বস্তি, স্বচ্ছলতা আর নতুন এক সুখের সকাল।
প্রবাসের ঈদ তাই এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি। যেখানে আনন্দ আর বেদনা পাশাপাশি হাঁটে, হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে কান্না, আর হৃদয়ের গভীরে জমে থাকে না বলা হাজার গল্প।