ছেলেরা যুগ্মসচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আর মা পড়ে ছিলেন প.চাগলা লা.শ হয়ে!
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ ১৫:২০
ছবি: সংগৃহীত
জীবনের শেষ বয়সে মানুষ সাধারণত ফিরে যেতে চান আপনজনের কাছে। সন্তানের মুখ, নাতি-নাতনির হাসি, কিংবা অন্তত কারও খোঁজ নেওয়ার শব্দ; এসবই হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। কিন্তু সব মায়ের ভাগ্যে সেই সৌভাগ্য জোটে না।
ঢাকার পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের চতুর্থ তলার একটি ঘরে নিঃশব্দে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন প্রায় ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম। মৃত্যুর পরও তিন-চার দিন পড়ে ছিল তার নিথর দেহ। ধীরে ধীরে শরীরে পচন ধরেছে, চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে মৃত্যুর গন্ধ। অথচ সেই ঘরের বাইরেই ছিল মানুষের বসবাস, ছিল আপনজনের উপস্থিতি। তবু কেউ টের পায়নি; অথবা পাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।
পুলিশের ভাষ্যমতে, নূরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে মেয়ের বাসার একটি কক্ষে একাকী বসবাস করছিলেন। ঘরটি ছিল আবর্জনায় ভরা। দেখে মনে হয়েছে বহু বছর কেউ সেখানে ঢোকেনি। যেন ঘরটি ধীরে ধীরে মানুষের বসবাসের জায়গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক নিঃসঙ্গ দ্বীপে পরিণত হয়েছিল। আর সেই দ্বীপের একমাত্র বাসিন্দা ছিলেন একজন মা।
যে মায়ের সন্তানদের একজন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত যুগ্মসচিব, আরেকজন দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বুয়েটের শিক্ষক। সমাজের চোখে তারা সফল, প্রতিষ্ঠিত, সম্মানিত। কিন্তু সেই সাফল্যের আলোর বাইরে কোথাও একজন বৃদ্ধা মা নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছিলেন; সেটি হয়তো কারও নজরে আসেনি।
এই ঘটনা শুধু একটি মৃত্যুর সংবাদ নয়; এটি আমাদের সময়ের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। যেখানে মানুষ কর্মব্যস্ত, সফলতার দৌড়ে অগ্রসর, কিন্তু ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে সম্পর্কের উষ্ণতা থেকে। বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার সবচেয়ে বড় চাওয়া অর্থ বা সম্পদ নয়; তারা চান একটু সময়, একটু কথা, একটু খোঁজখবর।
নূরজাহান বেগমের শেষ কয়েকটি দিন কেমন কেটেছিল, তা আর কেউ জানবে না। হয়তো তিনি অপেক্ষা করেছিলেন কারও পদচারণার শব্দের জন্য। হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলেন; আজ কেউ আসবে। হয়তো ফোনের রিং শুনতে চেয়েছিলেন, কিংবা শুধু জানতে চেয়েছিলেন, “মা, তুমি কেমন আছো?”
কিন্তু সেই প্রশ্ন আর কেউ করেনি।
মৃত্যুর পর তার নিথর দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ গ্রহণ করেছেন তার এক ছেলে। কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্তে যে শূন্যতা, যে নিঃসঙ্গতা তাকে ঘিরে রেখেছিল, তার দায় কি শুধু একটি পরিবারের? নাকি পুরো সমাজের?
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়; মানুষের জীবনে সাফল্যের মাপকাঠি শুধু পদ-পদবি বা অর্জন নয়। একজন বৃদ্ধ মা-বাবার মুখে শেষ বয়সে হাসি ফোটাতে পারাও এক ধরনের বড় সাফল্য।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যু তাই শুধু একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি এক নীরব প্রশ্ন। যে প্রশ্ন আমাদের প্রত্যেকের কাছে; আমরা কি সত্যিই আমাদের প্রিয়জনদের জন্য সময় বের করতে পারছি? নাকি একদিন তাদের নিঃসঙ্গতার খবরও আমাদের কাছে পৌঁছাবে অনেক দেরিতে?
একজন মা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। রেখে গেছেন একটি নিঃশব্দ আর্তনাদ; যা হয়তো কোনো আদালতে বিচার পাবে না, কিন্তু মানবতার আদালতে দীর্ঘদিন প্রতিধ্বনিত হবে।
