বিশ্বকাপ ২০২৬
আর্জেন্টিনা ও বাল্যস্মৃতি: মেরাডোনা থেকে মেসি, চার দশকের আবেগের গল্প
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ ১০:৫৪
১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার হাতে বিশ্বকাপ (ছবি: সংগৃহীত)
ফুটবল তখনো ঠিক বুঝে উঠিনি। ফুটবল মানে ছিল মাঠে গিয়ে বলে লাথি মারা, আর যে যত দূরে বল পাঠাতে পারত, সে তত ভালো খেলোয়াড়। শিশুমনের সরল সেই ধারণা নিয়েই খেলাধুলার জগতে প্রথম পা রাখা। কিন্তু এক রাতে সবকিছু বদলে গেল।
দাদু হঠাৎ বললেন, ‘চলো, আজ রাতে বিশ্বকাপের খেলা দেখতে যাব।’ তখন ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ চলছে। গায়ে ছিল মেরাডোনা মার্কা টি-শার্ট। গ্রামের এক বাড়িতে সাদা-কালো টেলিভিশনের সামনে বসে পড়লাম। টেলিভিশনের পর্দায় কাউকে চিনতাম না, শুধু একজন ছাড়া; দিয়েগো আরমান্দো মেরাডোনা। দল দুটিকে আলাদা করার উপায় ছিল শুধু শর্টসের রং দেখে। সেই রাতেই শুরু হয় এক আজীবন সম্পর্ক, এক অবিচ্ছেদ্য আবেগের যাত্রা; আর্জেন্টিনার সঙ্গে।
বিশ্বকাপের মাত্র তিনটি ম্যাচ দেখেছিলাম; কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল। কিন্তু সেই তিন ম্যাচই আমার ফুটবল দেখার চোখ বদলে দিয়েছিল চিরদিনের জন্য।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল: এক ম্যাচে মানব ও দেবতার রূপ
২২ জুন ১৯৮৬। মেক্সিকোর আজটেকা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি তখনো তাজা। ম্যাচটি ছিল শুধু ফুটবল নয়, ছিল আবেগ, ইতিহাস ও আত্মমর্যাদার লড়াই।
মেরাডোনা প্রথমে করলেন বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। পুরো পৃথিবী বিস্মিত। কিন্তু মাত্র চার মিনিট পর তিনি এমন এক গোল করলেন, যা ফুটবল ইতিহাসে “গোল অব দ্য সেঞ্চুরি” নামে অমর হয়ে আছে। নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে শুরু করা সেই দৌড়ে একে একে ইংল্যান্ডের পাঁচজন খেলোয়াড় ও গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি।
সেদিন মনে হয়েছিল, ফুটবল শুধু খেলা নয়; এ এক শিল্প। সেই মুহূর্তেই আর্জেন্টিনার প্রতি জন্ম নেয় এক অদ্ভুত টান।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেমিফাইনাল: জাদুকরের একক প্রদর্শনী
কোয়ার্টার ফাইনালের উত্তেজনার পর সেমিফাইনালে ছিল বেলজিয়াম। এখানে কোনো বিতর্ক ছিল না, ছিল কেবল মেরাডোনার বিশুদ্ধ ফুটবল প্রতিভার প্রদর্শনী। দুটি অসাধারণ গোল করে তিনি একাই আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলে দেন। বিশেষ করে দ্বিতীয় গোলটি ছিল ড্রিবলিং, গতি ও দক্ষতার এক নিখুঁত উদাহরণ। মনে হচ্ছিল, মাঠে ২২ জন খেলোয়াড় থাকলেও পুরো খেলা যেন একজন মানুষকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।
পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফাইনাল: নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ
২৯ জুন ১৯৮৬। ফাইনালে প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানি। জার্মান কোচ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার বিশেষ পরিকল্পনা করেছিলেন মেরাডোনাকে থামানোর জন্য। লোথার ম্যাথিউস সারাক্ষণ তাকে পাহারা দিয়েছেন।
মেরাডোনা সেদিন গোল পাননি। কিন্তু প্রকৃত মহান খেলোয়াড়েরা শুধু গোল করেই ম্যাচ জেতান না; তারা ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন নিজেদের চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতায়। ম্যাচ যখন ২-২ সমতায়, তখন মাত্র ছয় মিনিট বাকি। ঠিক সেই সময় মাঝমাঠ থেকে মেরাডোনার এক জাদুকরী পাস পৌঁছে যায় হোর্হে বুরুচাগার পায়ে। বুরুচাগা গোল করেন। আর্জেন্টিনা হয়ে যায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
সেদিন ট্রফি হাতে মেরাডোনার হাসি কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে যায়।
চার দশকের ভালোবাসা
১৯৮৬ সালের সেই তিন ম্যাচ থেকেই শুরু। এরপর আর্জেন্টিনা আর শুধু একটি ফুটবল দল ছিল না; হয়ে উঠেছিল জীবনের অংশ।
মেরাডোনার পর এলেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, হুয়ান রোমান রিকেলমে, হার্নান ক্রেসপো, হাভিয়ের সাভিওলা। প্রজন্ম বদলেছে, খেলোয়াড় বদলেছে, কিন্তু আকাশী-সাদা জার্সির প্রতি ভালোবাসা বদলায়নি।
এই দীর্ঘ পথচলায় ছিল অনেক আনন্দ, আবার অনেক বেদনাও। ১৯৯০ সালের ফাইনালের কান্না, ২০১৪ সালের ফাইনালের হতাশা; সবকিছুই যেন সমর্থকদের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছিল।
অবশেষে ২০২২ সালে কাতারের মরুভূমিতে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে। লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি উঠতেই মনে হয়েছিল, ৩৬ বছরের অসমাপ্ত গল্পটি পূর্ণতা পেল। মেসির হাসির ভেতর যেন দেখা যাচ্ছিল ১৯৮৬ সালের সেই মেরাডোনাকে; আজটেকা স্টেডিয়ামে ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক অমর কিংবদন্তিকে।
আজও যখন আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সি চোখে পড়ে, তখন শুধু একটি ফুটবল দলকে দেখি না। দেখতে পাই দাদুর হাত ধরে বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়া এক কৌতূহলী শিশুকে। দেখতে পাই সাদা-কালো টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা এক বিস্মিত দর্শককে। দেখতে পাই মেরাডোনার জাদুকরী ড্রিবলিং, বুরুচাগার সেই দৌড়, আর মেসির বিশ্বজয়ের হাসি।
আর্জেন্টিনা আমার কাছে কোনো দেশের ফুটবল দল নয়; এটি আমার শৈশব, আমার স্মৃতি, আমার আবেগ, আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।