https://www.emjanews.com/

16393

international

প্রকাশিত

১৪ জুন ২০২৬ ২০:০৭

আন্তর্জাতিক

জনসংখ্যা ১ কোটিতে সীমাবদ্ধ করতে চায় সুইজারল্যান্ড

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ ২০:০৭

ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ ও উচ্চ জীবনমানসম্পন্ন দেশ সুইজারল্যান্ড এবার এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে। দেশটির জনগণ গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে যাচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের জনসংখ্যা ১ কোটির (১০ মিলিয়ন) বেশি হতে দেওয়া হবে কি না। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে সুইজারল্যান্ড সরাসরি জনসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের পথে হাঁটবে।

বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ বা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতে বিভিন্ন দেশে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও গণভোটের মাধ্যমে একটি দেশের মোট জনসংখ্যার নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়ার উদ্যোগ কার্যত নজিরবিহীন।

প্রস্তাবটির পেছনে রয়েছে দেশটির ডানপন্থী রাজনৈতিক দল সুইস পিপলস পার্টি (এসভিপি)। দলটি একে ‘সাসটেইনেবিলিটি ইনিশিয়েটিভ’ বা টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছানোর পর থেকেই সরকারকে নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণে কড়াকড়ি, বিদেশি কর্মীদের পরিবার পুনর্মিলন সীমিত করা, আবাসন অনুমতি কঠোর করা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার মতো ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

এসভিপির দাবি, নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসনের ফলে দেশটি দ্রুত জনবহুল হয়ে উঠছে। ২০০২ সালে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ছিল ৭৩ লাখ, যা বর্তমানে বেড়ে প্রায় ৯১ লাখে পৌঁছেছে। বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশই বিদেশি নাগরিক।

প্রস্তাবের সমর্থকদের মতে, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আবাসন সংকট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, যানজট, গণপরিবহনে অতিরিক্ত চাপ এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় বেড়েছে।

এসভিপির নেতা Nils Fiechter মনে করেন, অভিবাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালে সুইজারল্যান্ড তার স্বকীয়তা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

তবে প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে সুইস সরকার, পার্লামেন্টের অধিকাংশ দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, আবাসন সংকট বা স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধির জন্য শুধুমাত্র অভিবাসীদের দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। সমালোচকদের ভাষায়, এটি ‘কেওস ইনিশিয়েটিভ’ বা বিশৃঙ্খলাপূর্ণ প্রস্তাব।

সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিক Helene Jenis বলেন, বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্যবিমা কিংবা আবাসন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত অভিবাসীরা নেয় না। তাই সব সমস্যার জন্য তাদের দায়ী করা বিভাজন বাড়াবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির হোটেল, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ ও প্রযুক্তি খাতে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী কর্মরত রয়েছেন।

দেশটির শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন Economiesuisse-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ Rudolf Minsch সতর্ক করে বলেছেন, প্রস্তাবটি পাস হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে যদি অবাধ চলাচল চুক্তি বাতিল করতে হয়, তাহলে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশাধিকার ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে জনসংখ্যাবিদদের মতে, সুইজারল্যান্ডের সামনে আরও বড় বাস্তবতা হলো কম জন্মহার ও দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা জনগোষ্ঠী। বর্তমানে দেশটির প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের বয়স ৬৫ বছরের বেশি।

ভবিষ্যতে শ্রমবাজার সচল রাখা, পেনশন ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যসেবা খাত পরিচালনার জন্য আরও কর্মক্ষম মানুষের প্রয়োজন হবে। কিন্তু দেশের নিজস্ব জন্মহার সেই চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। ফলে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে।

বিশ্বে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন নীতি থাকলেও সরাসরি গণভোটের মাধ্যমে সর্বোচ্চ জনসংখ্যা নির্ধারণের উদ্যোগ আগে দেখা যায়নি। জনসংখ্যাবিদ Philippe Wanner এই উদ্যোগকে ‘কার্যত নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন।

সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫২ শতাংশ ভোটার প্রস্তাবটির বিরোধিতা করছেন, আর ৪৫ শতাংশ সমর্থন করছেন। ফলে গণভোটের ফলাফল নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোট কেবল সুইজারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নয়, বরং অভিবাসন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জাতীয় পরিচয় এবং অর্থনৈতিক চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বৈশ্বিক বিতর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করবে।