https://www.emjanews.com/

18698

national

প্রকাশিত

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০৯

জাতীয়

একদিনে ২৬ লাখ টাকার ইলিশ!

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০৯

ছবি সংগৃহিত

 

টানা পাঁচ দিন সাগরে জাল ফেলেও ইলিশের দেখা পাননি তাঁরা। ষষ্ঠ দিনে মহেশখালী উপকূলের কাছে জাল ফেলতেই বদলে গেল ভাগ্য। একবারের জালেই ধরা পড়ল ২ হাজার ২০০ ইলিশ। ঘাটে এনে এসব ইলিশ বিক্রি হলো ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায়।

কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছটা ঘাটে এভাবেই চমক দেখিয়েছে মাছ ধরার ট্রলার এফভি কুলসুমা। সাত দিন সাগরে কাটিয়ে গত সোমবার সকালে ট্রলারটি ঘাটে ফেরে। এরপর ফিশারিঘাটের পাইকারি মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে শুরু হয় মাছ নামানো ও বিক্রির তোড়জোড়। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবসায়ীরা কিনে নেন ট্রলারে ধরা ২ হাজার ২০০ ইলিশ।

প্রতিটি ইলিশের ওজন ছিল প্রায় ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম। ২ হাজার ২০০ ইলিশ বিক্রি করে পাওয়া যায় ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পরে বরফমিশ্রিত কার্টনে ইলিশগুলো ঢাকায় পাঠানো হয়।

ট্রলারের ১২ জেলের মুখেও তখন হাসি। তাঁদের প্রত্যেকে ইলিশ বিক্রির টাকা থেকে খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা করে পাবেন। এক মৌসুমের খরচ মেটানোর জন্য এই অর্থ খুব বেশি না হলেও টানা কয়েক দিনের হতাশার পর এক দিনের এই আয় তাঁদের কাছে বড় স্বস্তির।

ট্রলারের মালিক আমান উল্লাহ বলেন, ছয় দিন সাগরে ভেসে থেকেও তাঁরা তেমন মাছের দেখা পাননি। ষষ্ঠ দিনে মহেশখালীর তাজিয়াকাটা এলাকার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে জাল ফেলে এত ইলিশ পাওয়া যাবে, তা তাঁরা ভাবতেও পারেননি।

জেলে মো. আলমগীর বলেন, টানা পাঁচ দিন সাগরের বিভিন্ন এলাকায় জাল ফেলেও ইলিশ পাওয়া যায়নি। ষষ্ঠ দিনে মহেশখালী উপকূলে জাল ফেলতেই একসঙ্গে ২ হাজার ২০০ ইলিশ ধরা পড়ে। তাঁর ভাষায়, এই মাছ তাঁদের ভাগ্য ফিরিয়েছে।


এফভি কুলসুমার ২ হাজার ২০০ ইলিশ ধরা পড়ার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ফিশারিঘাটে। ব্যবসায়ীরা জানান, মৌসুমে এত বেশি ইলিশ একসঙ্গে কোনো ট্রলারে ধরা পড়ার ঘটনা খুব বেশি দেখা যায়নি।

ফিশারিঘাটে গত কয়েক দিনে সাগর থেকে অন্তত ৩০০ ট্রলার এসেছে। এসব ট্রলারের প্রতিটিতে সাধারণত ২০০ থেকে ৩০০টি ইলিশ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইলিশ এসেছে এফভি কুলসুমায়।

সোমবার ফিশারিঘাটে ১ কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রায় ১ হাজার ৭০০ টাকা, ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা এবং ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাঝারি আকারের বেশির ভাগ ইলিশের পেটে ডিম রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলে ও ব্যবসায়ীরা।

তবে এফভি কুলসুমার ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকার ইলিশের গল্পটি যেন সামগ্রিক চিত্রের বিপরীত। কক্সবাজারের মাছ ধরার ট্রলারগুলোর বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে রয়েছে।

কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, জেলার ছোট-বড় প্রায় ৬ হাজার ট্রলারের মধ্যে ৪ হাজারই ঘাটে পড়ে আছে। বাকি প্রায় ২ হাজার ট্রলার সাগরে গেলেও ইলিশসহ অন্যান্য মাছ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না।

সাত দিনের একটি ট্রিপে একটি ট্রলারের খরচ হয় প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা। অথচ মাছ বিক্রি করে অনেক সময় ১ থেকে ৩ লাখ টাকাও পাওয়া যায় না। ফলে লোকসান গুনতে গুনতে অনেক ট্রলার মালিক ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। জেলার ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি জেলে ও জেলেশ্রমিকও এই সংকটে পড়েছেন।

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশরাফুল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রদূষণ, প্লাস্টিক ও ছেঁড়া জালের কারণে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বাড়ায় মাছের ডিম ও পোনা নষ্ট হচ্ছে। সাগরে যে পরিমাণ মাছের মজুত রয়েছে, তার চেয়ে বেশি আহরণ হওয়ায় মাছের সংকট তৈরি হয়েছে।

কক্সবাজার মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই বাজারে মোট মাছ অবতরণ হয়েছে ২ হাজার ৩৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইলিশ ছিল ৫২২ টন।

এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট মাছ অবতরণ হয়েছিল ৫ হাজার ৬৫৮ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ইলিশ ছিল ১ হাজার ৬২৮ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মাছ ও ইলিশের অবতরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী ও কুতুবদিয়াতেও ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ বেচাকেনা হয়। গত অর্থবছরে জেলায় ২০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি ইলিশ আহরণ হলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই থেকে আড়াই মাসে ৫০০ মেট্রিক টনও ইলিশ আহরণ হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে ছয় দিন সাগরে ভেসে থাকা এফভি কুলসুমার জালে একদিনে ২ হাজার ২০০ ইলিশ ধরা পড়া শুধু ১২ জেলের জন্য নয়, কক্সবাজারের মৎস্য ব্যবসায়ীদের জন্যও আশার খবর। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এমন সাফল্য নিয়মিত না হলে সামগ্রিক সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন।