ইউক্রেন- ডেনমার্কের ম্যাচে লুটিয়ে পড়েন পেসমেকার নিয়ে ফুটবল খেলা এরিকসেন
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ ০২:২৩
ছবি: সংগৃহীত
এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল স্টেডিয়াম। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ডেনমার্কের প্রীতি ম্যাচ চলাকালীন হঠাৎ মাঠে লুটিয়ে পড়েন ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেন। পাঁচ বছর আগে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকাময় ঘটনার স্মৃতি যেন আবার ফিরে আসে ফুটবলপ্রেমীদের মনে। সতীর্থদের উদ্বিগ্ন মুখ, দর্শকদের আতঙ্ক, মাঠে চিকিৎসকদের ছুটে আসা; সব মিলিয়ে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
তবে এবারও স্বস্তির খবর এসেছে দ্রুত। অল্প সময়ের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে পান এরিকসেন। পরে নিজেই হেঁটে মাঠ ত্যাগ করেন এবং হাসপাতাল থেকে সতীর্থদের উদ্দেশে বার্তা পাঠিয়ে জানান, তিনি ভালো আছেন।
ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেন শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম অনুপ্রেরণার নাম। ২০২১ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ফিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ চলাকালীন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাঠেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল তার। সেদিন পুরো বিশ্ব দেখেছিল জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে তার লড়াই। অনেকেই ভেবেছিলেন, এটাই হয়তো তার ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়।
কিন্তু সেখানেই গল্পের সমাপ্তি হয়নি।
চিকিৎসকদের পরামর্শে তার শরীরে বসানো হয় একটি ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর (ICD), যা সাধারণভাবে পেসমেকার হিসেবে পরিচিত। অনেকের ধারণা ছিল, এমন যন্ত্র শরীরে থাকলে হয়তো আর পেশাদার ফুটবল খেলা সম্ভব নয়। এরিকসেন সেই ধারণাকেই ভুল প্রমাণ করেছেন।
পেসমেকার নিয়ে তিনি শুধু মাঠে ফিরেননি, বরং সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবল খেলেছেন। ব্রেন্টফোর্ডে ফিরে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন, পরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো ক্লাবের জার্সি গায়ে চাপিয়েছেন। এরপর জার্মানির ভলফসবুর্গেও নিয়মিত খেলেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলেও ডেনমার্কের হয়ে শতাধিক ম্যাচ খেলে গেছেন সমান দক্ষতায়।
এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কতটা এগিয়েছে। একসময় যে হৃদরোগ একজন ক্রীড়াবিদের ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে পারত, আজ সঠিক চিকিৎসা, প্রযুক্তি এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সেই মানুষই আবার প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ফিরতে পারছেন। এরিকসেন তার জীবন্ত উদাহরণ।
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে মানবিক দিকটি ছিল মাঠের দৃশ্য। দুই দলের খেলোয়াড়রা মিলে তাকে ঘিরে মানববৃত্ত তৈরি করেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলে সবাই তখন একজন সহকর্মী, একজন বন্ধু এবং একজন মানুষের সুস্থতার জন্য উদ্বিগ্ন। ফুটবলের সৌন্দর্যও এখানেই; জয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানবতা।
ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেনের সাম্প্রতিক অসুস্থতা অবশ্যই উদ্বেগের। তার শারীরিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে ফুটবল বিশ্ব। কিন্তু একটি বিষয় আবারও স্পষ্ট হয়েছে; পেসমেকার বা হৃদরোগ মানেই জীবনের সব স্বপ্ন থেমে যাওয়া নয়। সঠিক চিকিৎসা, মানসিক দৃঢ়তা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতাকেও হার মানানো যায়।
এরিকসেন সেই লড়াইয়ের নাম। তিনি প্রমাণ করেছেন, হৃদয়ের স্পন্দন কখনও শুধু একটি যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; অনেক সময় তা বেঁচে থাকে স্বপ্ন, সাহস এবং ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসায়।