বিশ্বকাপ ২০২৬
জয়ের দেখা পেল না ব্রাজিল, প্রথমার্ধে সেলেসাওদের নাচাল মরক্কো
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ ০৬:১৩
ছবি: সংগৃহীত
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আলো ঝলমলে রাতে ফুটবল যেন এক অনিশ্চয়তার কবিতা হয়ে উঠেছিল। কাগজ-কলমে ব্রাজিল ছিল ফেভারিট, ইতিহাস ছিল তাদের পক্ষে, কিন্তু মাঠে প্রথমার্ধের গল্প লিখেছে মরক্কো। শৃঙ্খলা, গতি আর আত্মবিশ্বাসে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা এমন ফুটবল উপহার দিয়েছে, যেন পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদেরও নতুন করে নিজেদের পরিচয় খুঁজে নিতে হয়েছে।
ম্যাচ শেষে দেখা গেলো ব্রাজিলের পায়ে ছিলে ৫৪ শতাংশ বল আর মরক্কোর ছিল ৪৬। অন টার্গেট ব্রাজিলের ৫টি শটের বিপরীতে মরক্কোর ৪টি শট। মরক্কোর ২টি কর্ণারের বিপরীতে ব্রাজিল ৬টি কর্ণার আদায় করেছে। দুদলের খেলোয়াড় মিলে ৩০টি ফাউল করেছে। ব্রাজিল ২টি হলুদ কার্ড দেখেছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই মরক্কো ছিল আগ্রাসী। হাই প্রেসিং আর দ্রুতগতির আক্রমণে তারা ব্রাজিলের রক্ষণকে বারবার অস্থির করে তোলে। ষষ্ঠ মিনিটেই গোলের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল মরক্কো। ডান প্রান্ত থেকে ছোট ছোট পাসের কারুকাজে তৈরি আক্রমণে বল পৌঁছে যায় বেনজামিন এল আইনুইয়ের পায়ে। শটও নিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু শেষ মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ব্রাজিলকে বিপদমুক্ত করেন।
প্রথম দশ মিনিটে সেলেসাওদের খেলায় ছিল অস্বস্তি আর ছন্দহীনতা। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা গুছিয়ে উঠতে শুরু করে তারা। এক দ্রুত পাল্টা আক্রমণে গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন ইগর থিয়াগো। নিখুঁত পাসও পেয়েছিলেন, কিন্তু ভাগ্য যেন তখনও অপেক্ষা করছিল অন্য কোনো নাটকের জন্য। বলের সঙ্গে ঠিকমতো মাথার সংযোগ করতে না পারায় সুযোগটি হাতছাড়া হয়।
এরপর আসে ম্যাচের প্রথম বড় মোড়।
২১ মিনিটে ব্রাহিম দিয়াজের চমৎকার থ্রু পাস ছিন্নভিন্ন করে দেয় ব্রাজিলের রক্ষণভাগ। সেই পাস ধরে দারুণ গতিতে এগিয়ে যান ইসমায়েল সাইবারি। সামনে এগিয়ে আসা আলিসনের মাথার ওপর দিয়ে নিখুঁত চিপ শটে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে মরক্কোর সমর্থকরা। গোলটি ছিল কেবল স্কোরবোর্ডে এগিয়ে যাওয়ার গল্প নয়, বরং সাহস আর আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল প্রকাশ।
গোল হজমের পর ব্রাজিল আরও কিছুটা অগোছালো হয়ে পড়ে। মাঝমাঠে ছন্দ হারায় তারা, আক্রমণেও দেখা দেয় অস্থিরতা। ঠিক তখনই প্রয়োজন ছিল এমন একজনের, যিনি নিজের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
সেই দায়িত্ব তুলে নেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।

৩২ মিনিটে বাঁ প্রান্ত দিয়ে দুরন্ত গতিতে মরক্কোর বক্সে ঢুকে পড়েন তিনি। সামনে থাকা ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ডান পায়ের নিখুঁত শটে বল পাঠিয়ে দেন জালে। গোলরক্ষক কেবল তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি।
গোলটি যেন ছিল ভিনিসিয়ুসের স্বাক্ষর। রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে অসংখ্যবার দেখা সেই পরিচিত দৃশ্য; বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢোকা, ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করা এবং নিখুঁত ফিনিশিং। বিশ্বকাপের মঞ্চেও তিনি পুনরাবৃত্তি করলেন সেই শিল্পকর্ম। ব্রাজিলের হয়ে তাঁর ৫০তম ম্যাচে এ গোল নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
গোলের পর কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় ব্রাজিল। কিন্তু মরক্কোও পিছিয়ে যায়নি। তাদের সংগঠিত ফুটবল, আত্মবিশ্বাসী পাসিং এবং লড়াকু মানসিকতা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, তারা এখানে শুধু অংশ নিতে আসেনি; এসেছে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিতে।

শেষ পর্যন্ত ভিনিসিয়ুসের অসাধারণ গোল ব্রাজিলকে হার থেকে বাঁচালেও জয় এনে দিতে পারেনি। ১-১ গোলের ড্রয়ে শেষ হওয়া ম্যাচটি তাই শুধু একটি ফল নয়; এটি ছিল দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষ। একদিকে ইতিহাসের ভার, অন্যদিকে স্বপ্নের সাহস। আর সেই গল্পে মরক্কো প্রমাণ করেছে, বিশ্বকাপের মঞ্চে নামের চেয়ে মাঠের ফুটবলই শেষ কথা বলে।
