মালয়েশিয়ার অভিবাসন বন্দি শিবিরে আড়াই বছরে ১৪০ জনের মৃ/ত্যু
মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি ফোর্টিফাই রাইটসের
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ ২২:২৪
ছবি: সংগৃহীত
মালয়েশিয়ায় ২০২৪ সালে শুরু হওয়া কঠোর অভিবাসন অভিযান শুরুর পর থেকে দেশটির অভিবাসন আটককেন্দ্রে (ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টার) অন্তত ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আটককেন্দ্রগুলোর অতিরিক্ত ভিড়, চিকিৎসা অবহেলা ও অমানবিক পরিবেশকে এসব মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সংস্থাটি এ দাবি জানায়।
ফোর্টিফাই রাইটস জানায়, পার্লামেন্টে দেওয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির অভিবাসন আটককেন্দ্রে মোট ৪৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯৩ জন পুরুষ, ৬০ জন নারী এবং ১২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সম্মিলিতভাবে ১০৯ জন আটক অবস্থায় মারা যান। এ ছাড়া গত ১৪ জুলাই পার্লামেন্টে দেওয়া আরেকটি তথ্যে জানানো হয়, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আরও ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৪ সালে অভিযান শুরুর পর থেকে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪০ জনে।
ফোর্টিফাই রাইটসের মতে, ২০২৪ সালে সরকার ব্যাপক অভিবাসন অভিযান শুরু করার পর অনথিভুক্ত অভিবাসী ও শরণার্থীদের গ্রেপ্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০২৫ সালে গ্রেপ্তারের সংখ্যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
বর্তমানে মালয়েশিয়ার অভিবাসন আটককেন্দ্রগুলোতে ২২ হাজার ৪৫ জন আটক রয়েছেন, যেখানে সরকারি ঘোষিত ধারণক্ষমতা ২১ হাজার ৫৩০ জন। ফলে কেন্দ্রগুলো অতিরিক্ত ভিড়ে মানবিক সংকটে পড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আটককেন্দ্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে সেপসিস, লেপ্টোস্পাইরোসিস ও মেনিনজাইটিসের মতো রোগের কথা উল্লেখ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ফোর্টিফাই রাইটসের ভাষ্য, এসব রোগ অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন, অতিরিক্ত ভিড় এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে সৃষ্টি বা আরও গুরুতর হতে পারে। যথাযথ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে এসব মৃত্যুর অনেকগুলোই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।
২০২৫ সাল থেকে ফোর্টিফাই রাইটস মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অভিবাসন আটককেন্দ্র থেকে মুক্তি পাওয়া কয়েক ডজন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের অভিযোগ, অসুস্থ হলেও অনেক সময় চিকিৎসা দেওয়া হতো না, চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো, এমনকি চিকিৎসা চাইলে শাস্তির মুখেও পড়তে হয়েছে
বাংলাদেশি এক সাবেক আটক ব্যক্তি, যার ছদ্মনাম হোসেন, বলেন, অসুস্থতার কথা জানালে অনেককে মারধর করা হতো। ফলে অধিকাংশ বন্দি অসুস্থ হলেও তা জানাতে ভয় পেতেন। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুপথযাত্রী না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়া হতো না
আরেক রোহিঙ্গা শরণার্থী জানান, জ্বর, পেটব্যথা কিংবা মাথাব্যথা যে সমস্যাই হোক না কেন, প্রায় সব ক্ষেত্রেই শুধু একটি প্যারাসিটামল ট্যাবলেট দেওয়া হতো।
মিয়ানমারের এক শরণার্থী বলেন, দাঁতের তীব্র ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলেও দাঁত পরীক্ষা না করে কেবল প্যারাসিটামল দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়।
মিয়ানমারের আরেক সাবেক আটক ব্যক্তি, ছদ্মনাম জ্যাক, জানান, তিনি আটক অবস্থায় একজন থাই ও একজন ইন্দোনেশীয় বন্দির মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছেন।
তার ভাষ্য, এক থাই বন্দি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেও প্রথমে কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দেয়নি। পরে অন্য বন্দিদের চাপের মুখে তাকে একটি প্যারাসিটামল দিয়ে কয়েক ঘণ্টা পর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন জানা যায়, তিনি মারা গেছেন।
ফোর্টিফাই রাইটস বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী আটক প্রত্যেক ব্যক্তির পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো বৈষম্য ছাড়া সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
সংস্থাটি আরও উল্লেখ করে, জাতিসংঘের 'নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস' অনুযায়ী বন্দিদের সাধারণ নাগরিকদের সমমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং তা বিনামূল্যে দিতে হবে।
ফোর্টিফাই রাইটসের জ্যেষ্ঠ পরিচালক পিটার বাউকার্ট বলেন, অভিবাসন আটককেন্দ্রগুলোর ভয়াবহ পরিবেশ অপ্রয়োজনীয় মৃত্যুর জন্য দায়ী। নিজেদের হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের মানবিকভাবে রাখা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া মালয়েশিয়ার আইনি দায়িত্ব।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো মৃত্যু না ঘটে, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং অতীতের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।