ছবি: সংগৃহীত
আর মাত্র একটি ম্যাচ। তারপরই পর্দা নামবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। শিরোপা নির্ধারণী মহারণে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। বাংলাদেশ সময় সোমবার (২০ জুলাই) রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শুরু হবে বিশ্বকাপের ১০৪তম ও শেষ ম্যাচ।
ফাইনালটি শুধু দুই পরাশক্তির লড়াই নয়, বরং একাধিক ঐতিহাসিক রেকর্ড, পরিসংখ্যান এবং দুই প্রজন্মের দুই সুপারস্টার- লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামালের দ্বৈরথও।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। দুই দলেরই জয় ৬টি করে, আর দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। অর্থাৎ পরিসংখ্যানের বিচারে কোনো দলই এগিয়ে নয়।
বিশ্বকাপে অবশ্য একবারই দেখা হয়েছিল দুই দলের। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে সেই ম্যাচে ২-১ গোলে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা।
সাম্প্রতিক দুই সাক্ষাৎ ছিল গোলবন্যার। ২০১০ সালে প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৪-১ ব্যবধানে জয় পায়। তবে ২০১৮ সালে স্পেন ৬-১ গোলের বিশাল জয় তুলে নেয়, যেখানে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ইস্কো। চোটের কারণে সেই ম্যাচে খেলতে পারেননি লিওনেল মেসি।
প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন বনাম চ্যাম্পিয়ন
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এবারই প্রথম কোপা আমেরিকার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান শিরোপাধারী দল ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে।
আরেকটি অনন্য রেকর্ডও গড়তে যাচ্ছে এই ফাইনাল। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর (আর্জেন্টিনা) ও দুই নম্বর (স্পেন) দলের বিশ্বকাপের যেকোনো রাউন্ডে মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও এটিই প্রথম।
টানা দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্ন আর্জেন্টিনার
২০২২ সালের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে রয়েছে ইতিহাস গড়ার সুযোগ। ৬৪ বছর পর প্রথম দল হিসেবে এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার হাতছানি তাদের সামনে।
এর আগে কেবল ইতালি (১৯৩৪ ও ১৯৩৮) এবং ব্রাজিল (১৯৫৮ ও ১৯৬২) এই কীর্তি গড়তে পেরেছিল।
এটি আর্জেন্টিনার সপ্তম বিশ্বকাপ ফাইনাল। এর আগে ছয় ফাইনালের মধ্যে তারা তিনবার (১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২) শিরোপা জিতেছে এবং তিনবার (১৯৩০, ১৯৯০ ও ২০১৪) রানার্সআপ হয়েছে। তাদের চেয়ে বেশি ফাইনাল খেলেছে কেবল জার্মানি, আটবার।
শতভাগ জয়ে ইতিহাসের সামনে স্কালোনির দল
চলতি বিশ্বকাপে সাত ম্যাচের সবকটিতেই জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। ফাইনালেও জিততে পারলে ২০০২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে এক বিশ্বকাপে শতভাগ জয়ের রেকর্ড গড়বে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।
এবারের আসরে আর্জেন্টিনা করেছে ১৯ গোল, ম্যাচপ্রতি গড় ২.৭১। ১৯৭০ সালের ব্রাজিলের সমান গোল এটি। বিশ্বকাপের এক আসরে এর চেয়ে বেশি গোল করার নজির রয়েছে মাত্র চারবার।
এছাড়া টানা ১৩ বিশ্বকাপ ম্যাচে অন্তত দুটি করে গোল করার রেকর্ডও গড়েছে আলবিসেলেস্তেরা। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচের পর আর কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে তারা দুই গোলের কম করেনি।
বিশ্বকাপে টানা ১৬ ম্যাচে গোল করেছে আর্জেন্টিনা। ইতিহাসে তাদের চেয়ে দীর্ঘ গোলধারা রয়েছে শুধু হাঙ্গেরি, জার্মানি ও ব্রাজিলের।
স্পেনের দুর্দান্ত অপরাজিত যাত্রা
অন্যদিকে লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেনও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত তারা। ২০২৪ সালের মার্চে কলম্বিয়ার কাছে ১-০ গোলে হারার পর থেকে স্পেন জিতেছে ২৭ ম্যাচ এবং ড্র করেছে ১০টি।
এটি পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলের যৌথ দীর্ঘতম অপরাজিত ধারার রেকর্ড, যা ইতালি ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে গড়েছিল।
২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল। বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ছয় ফাইনালের মধ্যে পাঁচটিতেই শিরোপা জিতেছে তারা। ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের পাঁচ ফাইনালের চারটিতেও ট্রফি জিতেছে স্প্যানিশরা।
চলতি বিশ্বকাপে তারা করেছে ১৩ গোল, যা বিশ্বকাপে তাদের এক আসরের সর্বোচ্চ গোলসংখ্যা। একই সঙ্গে সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে স্পেন। ফাইনালেও রক্ষণভাগ শক্ত রাখলে সবচেয়ে কম গোল হজম করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার নতুন রেকর্ড গড়তে পারে তারা।
মেসি বনাম ইয়ামাল: দুই প্রজন্মের মহারণ
ফাইনালের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামালের মুখোমুখি লড়াই।
মেসি খেললে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে (২০১৪, ২০২২ ও ২০২৬) খেলার কীর্তি গড়বেন। এর আগে এই রেকর্ড ছিল কেবল ব্রাজিলের কাফুর।
এছাড়া ৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড়ও হবেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
অন্যদিকে মাত্র ১৯ বছর ৬ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলতে যাচ্ছেন স্পেনের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল। তার চেয়ে কম বয়সে ফাইনাল খেলেছেন কেবল ব্রাজিলের পেলে এবং ইতালির জুজেপ্পে বের্গমি।
দুইজনই যদি শুরুর একাদশে থাকেন, তবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার কোনো ফাইনালে দুই দলের দুই শুরুর একাদশের খেলোয়াড়ের বয়সের পার্থক্য হবে ২০ বছরেরও বেশি।
আক্রমণে আর্জেন্টিনা, রক্ষণে স্পেন
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সাত ম্যাচে সাতটি গোল হজম করেছে। বিপরীতে স্পেনের জালে বল জড়িয়েছে মাত্র একবার।
আর্জেন্টিনা এবার পাঁচটি গোল করেছে পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে, যা বিশ্বকাপের এক আসরে যৌথভাবে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে দুটি করেছেন মেসি। বাকি তিনটি এসেছে জিওভানি লো সেলসো, হুলিয়ান আলভারেজ ও এনজো ফার্নান্দেজের পা থেকে।
রদ্রির পাসের নতুন বিশ্বরেকর্ড
স্পেনের মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা রদ্রি চলতি বিশ্বকাপে সম্পন্ন করেছেন ৬৪৮টি সফল পাস, যা বিশ্বকাপের এক আসরে কোনো খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ। তিনি ভেঙেছেন ২০২২ বিশ্বকাপে নিজেরই গড়া ৬৩৮টি পাসের রেকর্ড।
এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন স্পেনের কিংবদন্তি জাভি হার্নান্দেজ, যিনি ২০১০ বিশ্বকাপে ৫৯৯টি সফল পাস দিয়েছিলেন। চলতি আসরে রদ্রির সবচেয়ে কাছাকাছি রয়েছেন তারই সতীর্থ পাউ কুবার্সি (৫৪৭) ও এমেরিক লাপোর্তে (৫৩৩)।
ইতিহাস কার পক্ষে?
পরিসংখ্যান বলছে, মুখোমুখি লড়াইয়ে দুই দল সমান। আর্জেন্টিনা রয়েছে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানিতে, অন্যদিকে স্পেন চায় ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বসেরা হতে।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনাল তাই শুধু একটি ম্যাচ নয়; এটি হতে যাচ্ছে ইতিহাস, পরিসংখ্যান, রেকর্ড আর দুই ফুটবল দর্শনের এক মহারণ।
