ছবি: সংগৃহীত
সরকারি নিষেধাজ্ঞা, আদালতের নির্দেশ ও একাধিক অভিযানের পরও সিলেটে অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলন থামেনি। বরং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জাফলং, বিছানাকান্দি, ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ চক্রের দৌরাত্ম্য আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, নদী-ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও পর্যটন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং ও বিছানাকান্দি, কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথর, শাহ আরেফিন টিলা, উৎমাছড়া ও রেলওয়ে বাংকার এলাকা, কানাইঘাটের লোভাছড়া এবং জৈন্তাপুরের শ্রীপুর, রংপানি ও বড়গাং এলাকায় দিন-রাত অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন চলছে। শ্রমিকরা নদীর তলদেশ থেকে পাথর তুলে নৌকায় করে নদীর তীরে এনে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাচ্ছেন।
ডেইলি স্টার এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশ খনিজ উন্নয়ন ব্যুরোর (বিওএমডি) গেজেটভুক্ত সিলেটের আটটি পাথর কোয়ারিতে ২০২০ সাল পর্যন্ত হাতে পাথর উত্তোলনের অনুমতি ছিল। তবে পরিবেশ রক্ষায় ২০১৪ সালে আদালত যান্ত্রিকভাবে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করেন এবং ২০১৫ সালে জাফলংয়ের ১৪ দশমিক ৯৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০২০ সালে সরকার সব ধরনের পাথর উত্তোলন বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর থেকে কার্যত পাথর লুট বন্ধ হয়ে যায়।
রিবেশবাদীদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জাফলংসহ বিভিন্ন এলাকায় নজিরবিহীন লুটপাট শুরু হয়। প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে শুধু জাফলং থেকেই কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি টাকার পাথর লুট করা হয়। একইভাবে ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর পর্যটনকেন্দ্রও অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় পাথরশূন্য হয়ে পড়ে। বিছানাকান্দির পাথরও লুট হয়ে যায়।
তৎকালীন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ২০২৫ সালের ২৬ জুলাই পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, ‘আমি দেখছি, পাথর উত্তোলনের পক্ষে সব দলের ঐকমত্য রয়েছে। চার বছর আন্দোলন করে জাফলংয়ে উত্তোলন বন্ধ রেখেছিলাম। কিন্তু উপদেষ্টা হিসেবে তা আর পারছি না।’
এই লুটপাটের ঘটনায় প্রশাসনিক অদলবদলও হয়। সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তর জাফলংয়ে পাথর লুটের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির চার নেতাসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে।
এরপর ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল পরিবেশ মন্ত্রণালয় জাফলংয়ের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটের আটটিসহ দেশের সব ১৭টি পাথর কোয়ারির ইজারা নিষিদ্ধ করে।
একই বছরের আগস্টে সাদা পাথর এলাকায় লুটপাটের ঘটনায় বাংলাদেশ খনিজ উন্নয়ন ব্যুরো (বিওএমডি) অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরের মাসে র্যাব কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৫ সালের আগস্টে তদন্ত শুরু করে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। তবে এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। এ সময় বিএনপি অভিযুক্ত নেতাদের সাময়িকভাবে বহিষ্কার করলেও পরে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সাহাব উদ্দিনকে পুনর্বহাল করে।
এদিকে, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত বলে অভিযোগ থাকা সিন্ডিকেটগুলো রাতের অন্ধকার ও ভোরবেলায় পাথর উত্তোলন অব্যাহত রাখে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এখন উত্তোলন শুধু নদীতলেই সীমাবদ্ধ নয়। গোয়াইনঘাটের জাফলং সেতু এবং কোম্পানীগঞ্জের ধলাই সেতুর পিলারের আশপাশ থেকেও বালু উত্তোলন চলছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে সেতুগুলো ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক এক পরিদর্শনে দেখা গেছে, প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো জৈন্তা রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা জাফলং প্যালেসের নিচ থেকেও ভিত্তির পাথর তুলে নেওয়া হচ্ছে।
বিওএমডির পরিচালক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল বলেন, ‘অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধে আমরা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছি। অভিযানে অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর-বালু জব্দ করে পরে টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। এছাড়া আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাসে দুবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।’
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এবং অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে গঠিত টাস্কফোর্স সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি বিজিবি ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
এদিকে, বিএনপি সরকার দেশের সব পাথর কোয়ারি পুনরায় চালু করা বা নতুন কোয়ারি যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি দলের সিলেট-৪ আসনের প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উল্লেখ্য, জেলার আটটির মধ্যে সাতটি কোয়ারি এবং আরও কয়েকটি অঘোষিত উত্তোলন এলাকা এ আসনের অন্তর্ভুক্ত। পরে তিনি শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় যোগ দেন।
তার উদ্যোগে ২০২৬ সালের ৭ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সিলেট ও সুনামগঞ্জের নির্বাচিত এলাকায় সীমিত আকারে পাথর উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাই করতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেন। কমিটি ইতোমধ্যে এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছে এবং সুপারিশমালা প্রস্তুত করছে।
গত ২৪ জুন আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘প্রচলিত পদ্ধতিতে হাতে পাথর উত্তোলনের জন্য কোয়ারিগুলো পুনরায় চালু করা হবে। অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হবে না এবং কঠোরভাবে তদারকি করা হবে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আদালতের উদ্বেগের কারণে এটি বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগতে পারে।’
তবে পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে বলেছেন, বছরের পর বছর অবৈধ উত্তোলনে সিলেটের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে, জীববৈচিত্র্য কমে গেছে এবং অনেক পাহাড় বিলীন হয়ে গেছে, যার ফলে বহু এলাকার প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য স্থায়ীভাবে বদলে গেছে।
তাদের মতে, আবারও পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলে পরিবেশের ক্ষতি আরও বাড়বে।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে শুধু নদী থেকে নয়, জাফলং সেতু ও ধলাই সেতুর পিলারের আশপাশ থেকেও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে সেতুর স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমনকি কয়েকশ বছরের পুরোনো জৈন্তা রাজ্যের ঐতিহাসিক জাফলং প্যালেসের ভিত্তির নিচ থেকেও পাথর তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তাছাড়া সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের নবসৃষ্ট হাজিপুর-আহারকান্দি বালুমহালে ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে ড্রেজার মেশিনে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইজারাভুক্ত এলাকার পাশাপাশি ইজারার বাইরে লুনী, কইন্না জঙ্গল, উত্তর ও দক্ষিণ প্রতাপপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে নদীতীর ভাঙন, ফসলি জমি, বসতভিটা, চা-বাগান ও খেলার মাঠ হুমকির মুখে পড়েছে। প্রসাশন মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে ইজারার বাইরে বালু উত্তোলনের দায়ে বোমা মেশিন ধ্বংস করেন। তবে ইজারাভুক্ত এলাকায় চলমান ড্রেজার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্রের সহযোগিতায় প্রতিদিন কোটি টাকার বালু উত্তোলন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। অতীতে এ বিষয়ে একাধিক লিখিত অভিযোগ ও মামলার পরও অবৈধ উত্তোলন বন্ধ হয়নি।
এদিকে সরকার সীমিত পরিসরে ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে হাতে পাথর উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাই করছে। এ লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, বছরের পর বছর অবৈধ উত্তোলনে সিলেটের পরিবেশগত ভারসাম্য ইতোমধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন আবার পাথর উত্তোলনের অনুমতি দিলে নদী, পাহাড়, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটনের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেলা) সিলেট আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শাহ শাহেদা আক্তার বলেন, ‘সিলেটের পাথর কোয়ারি বন্ধ রাখতে উচ্চ আদালতের আদেশ রয়েছে। সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত সেই আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।’
পরিবেশবাদীদের মতে, অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা না গেলে সিলেটের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পর্যটন শিল্প আরও বড় সংকটে পড়বে।
