তিন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশার বিকল্প খুঁজতে এআইইউবি শিক্ষার্থীদের গবেষণা
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫:৪৬
দেশের প্রচলিত তিন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশার বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব, জ্বালানিসাশ্রয়ী, নিরাপদ ও আধুনিক যানবাহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করেছেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) শিক্ষার্থীরা। বৈদ্যুতিক যান (ইভি) ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড বৈদ্যুতিক যান (পিএইচইভি) নিয়ে পরিচালিত এ গবেষণায় পরিবেশ সুরক্ষা, জ্বালানি সাশ্রয়, কার্বন নিঃসরণ কমানো, নিরাপদ চলাচল এবং টেকসই নগর পরিবহন ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এআইইউবির আয়োজনে ‘From Research to Reality: How We Built the EV/PHEV Feasibility Project’ শীর্ষক গবেষণা ও উদ্ভাবনী অনুষ্ঠানে এ গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী ও শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা ও সঞ্চালনা করেন এআইইউবির বাণিজ্য গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ও চিফ ইনভেস্টিগেটর অধ্যাপক ড. মুস্তাফা হাসান। প্রধান বক্তা ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এআইইউবির ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন ও উপদেষ্টা এবং নর্দান ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন থ্রিলীফ টেকনোলজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ তাজুল ইসলাম রুমেল। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক—আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ব্যবসায়িক উন্নয়ন রন্টি চৌধুরী এবং প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আল-আমরান। এ ছাড়া এআইইউবির হেড অব এমআইএস ডিপার্টমেন্ট মো. মেজবাউল হক নাহিদসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
গবেষণায় গুরুত্ব সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, কোনো প্রযুক্তি বা বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যথাযথ গবেষণা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা জরুরি। এতে প্রকল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, পরিবেশগত প্রভাব, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়।
তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিচালিত গবেষণাকে বাস্তব সমস্যার সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে গবেষণার সুফল সরাসরি দেশ ও মানুষের কাজে লাগানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকরা বাংলাদেশের নগর বাস্তবতায় ইভি ও পিএইচইভি ব্যবস্থার সম্ভাবনার পাশাপাশি চার্জিং অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
‘গবেষণা থেকে উদ্ভাবন, উদ্ভাবন থেকে বাস্তবায়ন’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শাহ তাজুল ইসলাম রুমেল বলেন, কোনো ধারণা বাস্তবে প্রয়োগের আগে এর প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও ব্যবহারিক দিক যাচাই করা প্রয়োজন। গবেষণা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে একটি প্রকল্পের বাস্তব সম্ভাবনা নির্ধারণ করা যায়। গবেষণা এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার মাধ্যমে যে কোন সমস্যা মোকাবেলা ও সমাধান করা যায় ।
তিনি তরুণ প্রজন্মকে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল প্রযুক্তির পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজে আরও বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
শাহ তাজুল ইসলাম রুমেল বলেন, “গবেষণা থেকে উদ্ভাবন, উদ্ভাবন থেকে বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়ন থেকে বাস্তব প্রভাব তৈরি করতে হবে।”
তিনি জানান, থ্রিলীফ টেকনোলজিস লিমিটেড গবেষণা, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও টেকসই প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। ভবিষ্যতে এআইইউবির শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌথভাবে বাস্তবমুখী গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাতের অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্ব
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রন্টি চৌধুরী বলেন, গবেষণার ফলাফলকে বাস্তব প্রয়োগে নিতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব প্রয়োজন। পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার সঙ্গে শিল্পখাতের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বাজার অভিজ্ঞতা যুক্ত হলে বাস্তবমুখী প্রকল্প তৈরি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের নগর পরিবহন ব্যবস্থায় টেকসই পরিবর্তন আনতে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
টেকসই পরিবহনে নতুন সম্ভাবনা
সংশ্লিষ্টরা বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে যানজট, বায়ুদূষণ, জ্বালানি ব্যয় ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বৈদ্যুতিক ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড যানবাহন ভবিষ্যতের নগর পরিবহনে বিকল্প সমাধানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এ ধরনের যানবাহনের ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যাটারি নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা এবং অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
গবেষণায় শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি
অনুষ্ঠানে এআইইউবি এফবিএ স্টুডেন্ট রিসার্চ গ্রুপের গবেষণা কার্যক্রম এবং বাংলাদেশে ইভি/পিএইচইভি উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমে অবদান রাখা সংশ্লিষ্ট প্রধান অতিথিকে সম্মাননা স্মারক ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের হাতে সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের যৌথ উদ্যোগে গবেষণা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দেশের পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, জ্বালানিসাশ্রয়ী ও প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সমাধান তৈরি হবে।
