মালয়েশিয়া ছাড়ছেন অবৈধ অভিবাসীরা, ফাইল ছবি
মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীবিরোধী অভিযান যত জোরদার হচ্ছে, ততই বাড়ছে দেশে ফেরার প্রবণতা। গ্রেফতার, মামলা ও কারাবন্দিত্ব এড়াতে সরকারি সুযোগ নিয়ে নিজ দেশে ফিরছেন কাগজপত্রহীন বিদেশিরা। ব্যাপক ধরপাকড়ের মধ্যেই মালয়েশিয়া সরকারের অভিবাসী প্রত্যাবাসন কর্মসূচি-২ (পিআরএম ২.০)-এর আওতায় নির্দিষ্ট শর্তে জরিমানা দিয়ে আইনি জটিলতা এড়িয়ে দেশে ফেরার সুযোগ মিলছে।
পিআরএম ২.০ চলবে ২০২৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত। ফলে দেশটিতে অবস্থানরত অবৈধ অভিবাসীদের সামনে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ আরও আট মাস থাকছে।
মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান এক বিবৃতিতে বলেছেন, ৩০ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা থাকা কর্মসূচি ২০২৬ সালের ১ মে থেকে ২০২৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কর্মসূচিটির কার্যকারিতা এবং বিপুলসংখ্যক বিদেশির সাড়া বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইমিগ্রেশন বিভাগের হিসাবে, ২০২৫ সালের ১৯ মে থেকে ২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ১১২ দেশের ২ লাখ ৫৪ হাজার ১৮৬ জন অনিবন্ধিত অভিবাসী এ কর্মসূচিতে নিবন্ধন করেছেন। এ সময় সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ১২৭ কোটি রিঙ্গিত।
তবে নিবন্ধনকারী ও দেশে ফিরে যাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা এক নয়। ইমিগ্রেশন বিভাগের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত প্রকাশিত সর্বশেষ বিস্তারিত হিসাবে, ওই সময় পর্যন্ত ২ লাখ ৪ হাজার ৫২৩ জন বিদেশি কর্মসূচির আওতায় স্বেচ্ছায় নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। একই সময়ে নিবন্ধন করেছিলেন ২ লাখ ২৮ হাজার ৯৬১ জন।
অর্থাৎ, ২৯ এপ্রিলের ২ লাখ ৫৪ হাজার ১৮৬ জন হলো কর্মসূচিতে নিবন্ধনকারী, আর ১৫ এপ্রিলের ২ লাখ ৪ হাজার ৫২৩ জন হলো বাস্তবে দেশে ফিরে যাওয়া বিদেশি। দুটি সংখ্যা একই সময়ের নয় এবং একই বিষয়ও নির্দেশ করে না।
ইমিগ্রেশন মহাপরিচালক জাকারিয়া শাবান জানান, কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক সবচেয়ে বেশি। এরপরই রয়েছে বাংলাদেশিরা। ফলে কর্মসূচিতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ অন্যতম বড়।
তবে এ পর্যন্ত ঠিক কতজন বাংলাদেশি পিআরএম ২.০-এর আওতায় দেশে ফিরেছেন, সে বিষয়ে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের প্রকাশ্য পরিসংখ্যানে পৃথক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
পিআরএম ২.০ মূলত অনিবন্ধিত বিদেশিদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়ার কর্মসূচি। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে নির্ধারিত জরিমানা পরিশোধের মাধ্যমে দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়।
মালয়েশিয়ার নিয়ম অনুযায়ী, বৈধ পাস ছাড়া দেশটিতে প্রবেশ বা অবস্থান এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থানের ক্ষেত্রে ৫০০ রিঙ্গিত জরিমানা এবং পাসের শর্ত ভঙ্গের ক্ষেত্রে ৩০০ রিঙ্গিত জরিমানা নির্ধারিত রয়েছে।
তবে আগের প্রত্যাবাসন কর্মসূচিতে নিবন্ধন করেও যারা দেশে ফেরেননি, ইমিগ্রেশন বিভাগের কালো তালিকাভুক্ত ব্যক্তি এবং কর্তৃপক্ষের খোঁজে থাকা ব্যক্তিরা এ সুবিধা থেকে বাদ পড়তে পারেন।
মালয়েশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন বিভাগের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত এসব অভিযানে বৈধ কাগজপত্রহীন বিদেশি নাগরিকদের আটক করা হচ্ছে। ফলে গ্রেফতার ও আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কায় অনেকেই সরকারি প্রত্যাবাসন কর্মসূচির সুযোগ নিতে চাইছেন।
অভিবাসনসংশ্লিষ্টদের মতে, অবৈধ অভিবাসীদের সামনে এখন দুটি পথ একদিকে ইমিগ্রেশনের অভিযান ও গ্রেফতারের ঝুঁকি, অন্যদিকে সরকারি ব্যবস্থায় স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ। এ কারণেই প্রত্যাবাসন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশিদের দ্রুত দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশন। হাইকমিশনের প্রথম সচিব (প্রেস) তরিকুল ইসলাম এক ভিডিও বার্তায় বলেন, পিআরএম ২.০-এর সুযোগ নিয়ে আইনসম্মত ও নিরাপদে দেশে ফেরার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়।
দেশে ফিরতে বৈধ ও মেয়াদযুক্ত বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকতে হবে। পাসপোর্ট না থাকলে বা মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ভ্রমণ অনুমতিপত্র নেওয়া যাবে। এরপর নিশ্চিত বিমান টিকিট নিয়ে নির্ধারিত ইমিগ্রেশন কার্যালয়ে আবেদনকারীকে নিজেকেই উপস্থিত হতে হবে।
আবেদনের সময় পাসপোর্ট বা ভ্রমণ অনুমতিপত্র, পাসপোর্টের পরিচিতি পৃষ্ঠার কপি, সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন পাসের কপি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পুরোনো ও নতুন পাসপোর্ট সঙ্গে রাখতে হবে।
পিআরএম ২.০-এর আবেদন নিয়ে দালালচক্র সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশিদের সতর্ক করেছে হাইকমিশন। তরিকুল ইসলাম বলেন, এ কর্মসূচিতে আবেদন করতে কোনো দালাল, প্রতিনিধি বা তৃতীয় পক্ষকে টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা বলে কেউ টাকা চাইলে সতর্ক থাকতে হবে। নিজের আবেদন নিজেকেই করার পাশাপাশি সরকারি নির্দেশনা অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
মালয়েশিয়া সরকারের বার্তা পরিষ্কার অবৈধ অভিবাসীদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু যারা এ সুযোগ নেবেন না তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে।
পিআরএম ২.০-এর মেয়াদ বাড়ানোর ফলে কাগজপত্রহীন বাংলাদেশিদের জন্য আরও এক বছর দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে অভিযানের মধ্যে গ্রেফতার হওয়ার পর আইনি জটিলতায় পড়ার চেয়ে আগেই সরকারি প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরাই নিরাপদ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘমেয়াদে অবৈধ অভিবাসন কমাতে বৈধ নিয়োগব্যবস্থা, স্বচ্ছ ভিসা প্রক্রিয়া এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের বৈধ কাগজপত্র সংরক্ষণ এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অভিবাসনসংশ্লিষ্টরা।