ছবি: সংগৃহীত
সকাল থেকে বাড়ির উঠান, আশপাশের পথঘাট; সবখানেই ছোট্ট তায়িফাকে খুঁজছিল স্বজনেরা। কেউ হয়তো ভাবছিল, খেলতে গিয়ে কোথাও লুকিয়েছে; কেউ ছুটছিল আশপাশের বাড়িতে। বাবা থানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নিখোঁজের জিডি করতে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার সেই খোঁজাখুঁজির শেষ হলো এমন এক দৃশ্যে, যা কোনো স্বজনের কল্পনাতেও আসার কথা নয়; নিজেদের বাড়িরই একটি কক্ষে বাক্সের ভেতর পাওয়া গেল তিন বছরের শিশু তায়িফা সুলতানার নিথর দেহ।
বান্দরবানের সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়নের সুয়ালক বাজারসংলগ্ন ময়দার মিল এলাকায় সোমবার এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় তার ফুফু নার্গিস সুলতানাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নিহত তায়িফা সুলতানা ওই এলাকার ইলিয়াস খানের মেয়ে। তিন বছরের এই শিশুটিই ছিল পরিবারের ছোট্ট আনন্দের কেন্দ্র। সোমবার সকাল থেকে হঠাৎ তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রথমে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের মতো করে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। বাড়ির আশপাশ, পরিচিত জায়গা; যেখানে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, সবখানেই খোঁজা হয়।
সময় গড়াতে থাকে। কিন্তু তায়িফার দেখা মেলে না।
উদ্বিগ্ন বাবা ইলিয়াস খান শেষ পর্যন্ত থানায় সাধারণ ডায়েরি করার জন্য যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। তখনো হয়তো তাঁর মনে ছিল, কোথাও না কোথাও নিরাপদেই আছে তাঁর ছোট্ট মেয়েটি। হয়তো একটু পরেই দৌড়ে এসে বাবার কোলে উঠবে।
কিন্তু সেই অপেক্ষার আর শেষ হয়নি।
পুলিশ জানায়, ইলিয়াস খানের বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নার্গিস সুলতানা শিশু তায়িফাকে নিজের কক্ষে নিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে পুলিশ তাঁর কক্ষে তল্লাশি চালায়।
সেখানেই মেলে ভয়ংকর সেই সত্য।
একটি বাক্সের ভেতর পাওয়া যায় তায়িফার মরদেহ।
যে শিশুকে কয়েক ঘণ্টা ধরে সবাই খুঁজছিল, যে শিশুকে ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবারের মানুষ ছুটে বেড়াচ্ছিলেন, সেই শিশুই তখন পড়ে ছিল একটি বাক্সের অন্ধকারে।
পুলিশের ভাষ্য, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নার্গিস সুলতানা তাঁর ভাতিজিকে গলাটিপে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।
ঘটনার পর পুরো পরিবার যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। স্বজনদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন; যে বাড়িতে আপনজনদের মাঝেই বেড়ে উঠছিল তায়িফা, সেই বাড়িতেই কীভাবে তার জীবনের এমন নির্মম পরিণতি হলো?
পরিবারের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর নার্গিস সুলতানা তাঁর ভাই ইলিয়াস খানের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতেন। আপন ভাতিজির এমন পরিণতিতে পরিবারের সবাই হতবাক। ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো দ্বন্দ্বের জেরে ঘটনা ঘটতে পারে বলে পরিবারের ওই সদস্য ধারণা করছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো কারণ জানা যায়নি।
তায়িফার মরদেহ উদ্ধারের পর বাড়িটিতে নেমে আসে শোকের ভারী নীরবতা। যে উঠানে হয়তো শিশুটির ছোটাছুটি, হাসি আর খেলার শব্দে মুখর থাকত, সেখানে এখন স্বজনদের কান্না।
একটি পরিবার সকালেও খুঁজছিল তাদের ছোট্ট মেয়েটিকে। সন্ধ্যার আগেই তাদের খুঁজে পাওয়ার আনন্দের জায়গা দখল করে নেয় শোক।
তিন বছরের একটি শিশুর পৃথিবী ছিল খুব ছোট; বাবা-মা, স্বজন, বাড়ির উঠান আর আপনজনদের ভালোবাসা। সেই পৃথিবীটুকুই মুহূর্তে থেমে গেল।
বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুদ পারভেজ বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে নার্গিস সুলতানার কক্ষে তল্লাশি চালানো হয়। সেখানে একটি বাক্স থেকে শিশু তায়িফার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলায় নার্গিস সুলতানাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এখন তায়িফার পরিবারের অপেক্ষা শুধু একটি সত্যের জন্য; কেন তাদের তিন বছরের শিশুটিকে এভাবে চলে যেতে হলো?
আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে পুলিশ।
