দফায় দফায় বৈঠকেও কাটেনি অচলাবস্থা, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষকদের মুক্তি দিলেন না আন্দোলনকারীরা
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:৩২
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনায় জেলা প্রশাসক ও সিসিক প্রশাসক (ছবি: ইমজা নিউজ)
সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে সোমবার দিনভর দফায় দফায় আলোচনা করেও কাটেনি অচলাবস্থা। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পর সন্ধ্যায় কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় বৈঠক করেন জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবির বিষয়ে আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক ভবনে দুদিন ধরে অবরুদ্ধ শিক্ষক-কর্মচারীদের মুক্ত করে দেওয়ার অনুরোধও জানান তাঁরা। তবে কোনো আশ্বাস ও অনুরোধেই সাড়া দেননি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
সোমবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কয়েক দফায় আলোচনার পরও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেননি শিক্ষার্থীরা। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে কলেজকে মুক্ত করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার বিষয়ে দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
প্রথমে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বৈঠক
সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যায়। সেখানে জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে তারা বৈঠক করে। বৈঠকে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে শিক্ষার্থীরা তাঁদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন দাবির বিষয় তুলে ধরেন। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে মুক্ত করা এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার দাবিকে তারা অগ্রাধিকার দেন।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য শোনার পর জেলা প্রশাসক তাঁদের দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে এসব দাবি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও সময়ের প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানানো হয়। এসময় শিক্ষার্থীরা তাদের কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার দাবি করেন। দাবির প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ক্যাম্পাসে যান।
সেখানে তাঁরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবির বিষয়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
আলোচনায় কলেজকে ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর, খেলার মাঠ সংস্কারসহ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবির বিষয়ও উঠে আসে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
তবে আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে প্রশাসনিক ভবনে আটকে থাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের মুক্তি।
আলোচনার একপর্যায়ে জেলা প্রশাসক ও সিসিক প্রশাসক শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে শিক্ষক-কর্মচারীদের মুক্ত করে দেওয়ার অনুরোধ জানান।
তাঁরা শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, আন্দোলন চললেও শিক্ষক-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করে রাখা সমাধানের পথ নয়। শিক্ষার্থীদের দাবি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে শিক্ষকদের মুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
কিন্তু শিক্ষার্থীরা তাঁদের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। দাবি পূরণে দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলবেন না এবং অবরুদ্ধ শিক্ষক-কর্মচারীদেরও মুক্ত করবেন না—এমন অবস্থানেই তাঁরা অনড় থাকেন। ফলে জেলা প্রশাসক ও সিসিক প্রশাসকের দীর্ঘ আলোচনার পরও শিক্ষক-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ অবস্থা কাটেনি।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার সময় সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের দাবি নিয়ে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। আগের সরকার তাঁদের দাবির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনো বেশি সময় পায়নি। তাই সরকারকে সময় দিতে হবে। জেলা প্রশাসক তাঁর নিজস্ব চ্যানেলে মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো তুলে ধরবেন এবং সমস্যাগুলোর সমাধানে উদ্যোগ নেবেন।
তবে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে আশ্বাস শুনলেও কার্যকর সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই এবার লিখিত বা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দাবি বাস্তবায়নের উদ্যোগ না দেখা পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন প্রত্যাহার করবেন না।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে রোববার দুপুর থেকে প্রশাসনিক ভবনে অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ ১৪ শিক্ষক। একই ভবনে আটকা পড়েছেন আরও ৬ থেকে ৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
সোমবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক ও সিসিক প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনার পরও তাঁদের মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
প্রশাসনিক ভবনে আটকা থাকা কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. খলিলুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি উচ্চতর কর্তৃপক্ষ ছাড়া কলেজ প্রশাসনের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। তারপরও তাঁদের আটকে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা দুদিন ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছি।’
দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শাটডাউন
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মুক্তির বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত কলেজের সব ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাব এবং একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।
তাঁদের দাবি, বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির স্বকীয়তা ও পেশাগত মান অক্ষুণ্ন রাখতে কলেজকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে মুক্ত করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করতে হবে।
এদিকে আন্দোলনের মধ্যে অধ্যক্ষ পদে বদলি ও নতুন করে দায়িত্ব দেওয়ার যে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে, সেটিও প্রত্যাখ্যান করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের ভাষ্য, মূল দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত নতুন দায়িত্ব পাওয়া অধ্যক্ষকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেওয়া হবে না এবং বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকেও বদলি কর্মস্থলে যেতে দেওয়া হবে না।
সব মিলিয়ে সোমবার জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন প্রশাসনের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনার পরও সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান সমাধান হয়নি। একদিকে দাবি আদায়ে অনড় শিক্ষার্থীরা, অন্যদিকে প্রশাসনিক ভবনে দুদিন ধরে অবরুদ্ধ শিক্ষক-কর্মচারীরা—এ অবস্থায় অচলাবস্থার মধ্যেই রাত পেরোচ্ছে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।
