চা-বাগানের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবায় সীমান্তিকের বিশেষ উদ্যোগ
নুরজাহান ও পাত্রখলায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাফি ও পুষ্টিসেবা; পাত্রখলায় উচ্চঝুঁকির গর্ভধারণ শনাক্ত ১৫ জনের
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ২১:১৬
ছবি: ইমজা নিউজ
মৌলভীবাজারের চা-বাগানের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ কর্মসূচি পরিচালনা করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সীমান্তিক। এর আওতায় গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাফি, শিশুদের পুষ্টি মূল্যায়ন এবং যক্ষ্মা শনাক্তকরণে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার (৩১ অক্টোবর) কমলগঞ্জ উপজেলার নুরজাহান চা-বাগানের হাসপাতালে মা সমাবেশ ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে ২৭ অক্টোবর একই উপজেলার পাত্রখলা চা-বাগানে এ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
সীমান্তিকের বাস্তবায়নাধীন ‘মোমেন্টাম ইন্টিগ্রেটেড হেলথ রেজিলিয়েন্স (এমআইএইচআর) বাংলাদেশ অ্যাক্টিভিটি’ প্রকল্পের আওতায় এসব কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। চা-বাগানের শ্রমজীবী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর গর্ভবতী মা, প্রসূতি মা, শিশু ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং মাতৃস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও যক্ষ্মা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
শনিবার নুরজাহান চা-বাগানের হাসপাতালে আয়োজিত কর্মসূচিতে ১৭ জন গর্ভবতী মাকে প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্য পরীক্ষা (এএনসি) এবং ১৭ জনকে এএনসি ও আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা দেওয়া হয়। এ ছাড়া তিনজন প্রসূতি মায়ের প্রসব-পরবর্তী স্বাস্থ্য পরীক্ষা (পিএনসি) করা হয়।
কর্মসূচিতে ১২ জন কিশোরী এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ৪৪ জন মাকে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ৪১ জনের বাহুর মধ্যভাগের পরিধি (এমইউএসি) পরিমাপ করে পুষ্টিগত অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। মায়েদের মধ্যে পুষ্টিসামগ্রীও বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নুরজাহান চা-বাগানের ম্যানেজার ইনচার্জ সৈয়দ মো. শাহরিয়ার। এ সময় সীমান্তিকের প্রকল্প জেলা সমন্বয়কারী মো. সামছুল আলম, ফিল্ড সুপারভাইজার নিলুকান্ত পাল, মিডওয়াইফ ফাহমিদা বেগম, ডাটা অ্যাসিস্ট্যান্ট লিপি ঘোষ, সনোলজিস্ট ডা. জান্নাতুল ফাতেমাসহ প্রকল্পের স্বাস্থ্যকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। চা-বাগানের স্বাস্থ্যকর্মী, কমিউনিটি লিডার, গর্ভবতী মা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও কর্মসূচিতে অংশ নেন।
এর আগে ২৭ অক্টোবর পাত্রখলা চা-বাগানে আয়োজিত কর্মসূচিতে ৪২ জন গর্ভবতী মায়ের এএনসি পরীক্ষা, ১০ জন প্রসূতি মায়ের পিএনসি পরীক্ষা এবং শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৩৭ শিশুর পুষ্টিগত অবস্থা যাচাই করা হয়। এ ছাড়া ৪১ জনের আলট্রাসনোগ্রাফি করা হয়।
এ কর্মসূচিতে ১৫ জনের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ শনাক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফারেলের পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি যক্ষ্মার উপসর্গ থাকা সন্দেহভাজন ছয়জনের কফের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
পাত্রখলা চা-বাগানের কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন জেএসআইয়ের ঢাকা কার্যালয়ের পরিচালক (এমআইএস ও আইটি) নাজমুল কবির, বাগানটির ম্যানেজার মো. ইউসুফ খান এবং কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাকুর আহমেদ। এ ছাড়া প্রকল্পের কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী, চা-বাগানের প্রতিনিধি ও উপকারভোগীরা অংশ নেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অর্থায়নে এবং জেএসআই রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কারিগরি সহায়তায় সীমান্তিক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। সিলেট বিভাগের সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার ছয়টি উপজেলার ৩৬টি চা-বাগানে এ কার্যক্রম চলছে।
মৌলভীবাজার জেলার তিনটি উপজেলার ২১টি চা-বাগানে প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গলে নয়টি, রাজনগরে সাতটি এবং কমলগঞ্জে পাঁচটি চা-বাগান রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে গর্ভবতী ও প্রসূতি মা, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং যক্ষ্মার সন্দেহভাজন রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
চা-বাগানের শ্রমজীবী পরিবারগুলোর অনেকের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা, গর্ভকালীন পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাফি, প্রসব-পরবর্তী সেবা ও শিশুর পুষ্টি মূল্যায়নের সুযোগ সীমিত। এ অবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং উচ্চঝুঁকির গর্ভধারণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে এ উদ্যোগ।
‘সুস্থ মা, সুস্থ শিশু, সমৃদ্ধ সমাজ’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিশুর পুষ্টি উন্নয়ন ও যক্ষ্মা প্রতিরোধে কাজ করছে প্রকল্পটি।