https://www.emjanews.com/

14055

international

প্রকাশিত

২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৯:৪০

আন্তর্জাতিক

ইরানে যুদ্ধের ফাঁদে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র!

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৯:৪০

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ইতিহাসে ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিল সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। পাঁচ দশক আগে কমিউনিস্ট বাহিনীর কাছে পরাজয়ের ক্ষত আজও পুরোপুরি শুকায়নি। সেই স্মৃতি নতুন করে নাড়া দিচ্ছে ইরান ইস্যুতে। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর শীর্ষ জেনারেল ও সহকারীরাও আশঙ্কা করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্র আবারও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে আটকে যেতে পারে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতোই, ইরান প্রশ্নেও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। অতীতে ইরাক ও আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ করে বিপুল প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে ওয়াশিংটন। আফগানিস্তানে দুই দশকের যুদ্ধে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা নিহত হন এবং ব্যয় হয় এক ট্রিলিয়নের বেশি ডলার। শেষ পর্যন্ত তালেবানের কাছে পরাজয় মেনে নিতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে।

২০২৫ সালের জুনে ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সীমিতভাবে জড়িয়ে পড়ে। ইরানের কয়েকটি পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানো হলেও প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিশ্চিত করা যায়নি। পাল্টা জবাবে ইরান যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বরাবরই ইরানকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে তুলে ধরছেন। তার শর্ত- ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে, না হলে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। প্রয়োজনে সামরিক আগ্রাসনের পথও বেছে নিতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলেছে। আরব সাগরে মোতায়েন রয়েছে যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, ডেস্ট্রয়ার ও সাবমেরিন। এছাড়া সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, ইরাক ও জর্ডানে অর্ধলক্ষাধিক মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। শিগগিরই বিশ্বের বৃহত্তম রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডও মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।

তবে এই প্রস্তুতি সত্ত্বেও মার্কিন মিত্রদের বড় অংশ ইরানে হামলার বিষয়ে আগ্রহী নয়। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন নিজেদের আকাশ ও ঘাঁটি ব্যবহারে আপত্তি জানিয়েছে। এমনকি যুক্তরাজ্যও এই ইস্যুতে ওয়াশিংটনের পাশে দাঁড়াচ্ছে না। ন্যাটো সদস্য তুরস্ক কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, আগ্রাসন হলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে। ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের হাশদ আল-শাবি ও লেবাননের হিজবুল্লাহ একযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ঘাঁটিতে হামলা চালাতে প্রস্তুত রয়েছে। সম্প্রতি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে তেহরান। চীন থেকে সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার খবরও প্রকাশ পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরান বা তার মিত্ররা মার্কিন রণতরী লক্ষ্য করে বড় হামলা চালায়, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

অন্যদিকে ইরান হামলার সবচেয়ে বড় পরিণতি হতে পারে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই পথে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলএনজি পরিবাহিত হয়। পথটি বন্ধ হলে ইউরোপ ও আমেরিকায় জ্বালানি সংকট তৈরি হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে।

সম্ভাব্য হামলা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। শীর্ষ জেনারেলরা ইরানে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে সতর্ক করছেন। তুরস্কের উদ্যোগে ইতোমধ্যে ওমান ও জেনেভায় দফায় দফায় আলোচনা চলছে। ট্রাম্প নিজেও সম্প্রতি বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানই তার অগ্রাধিকার, তবে প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপের পথ খোলা থাকবে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পরিবর্তে সীমিত পরিসরের প্রতীকী হামলা হতে পারে, যাতে ইসরাইল সন্তুষ্ট থাকে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বড় সংঘাতে না জড়ায়।

ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রকে শিখিয়েছে- সহজ কোনো যুদ্ধ নেই। ইরান ইস্যুতে সামরিক পদক্ষেপ নিলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বকেই অস্থির করে তুলতে পারে। তাই ওয়াশিংটনের সামনে এখন বড় প্রশ্ন- যুদ্ধের পথে হাঁটবে, নাকি কূটনীতির টেবিলে বসেই সংকট সামাল দেবে।