ছবি: অরুণ
মালয়েশিয়ার প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতার মাঝে আরও একটি হৃদয়বিদারক খবর এসে নাড়া দিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের। দূর প্রবাসে জীবিকার সন্ধানে আসা এক রেমিট্যান্স যোদ্ধার জীবন থেমে গেল হঠাৎই চিরতরে নিভে গেল তার স্বপ্ন, থেমে গেল পরিবারের জন্য লড়াই।
লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলার চররোহিতা গ্রামের বাসিন্দা সোলেমান হায়দার ও মাতা ছালেহা বেগমের ছেলে অরুণ (৪৪), সোমবার স্থানীয় সময় আনুমানিক দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে ইন্তেকাল করেন।
কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে অরুণ তার স্ত্রী মোসাম্মাৎ শাহানাজ শরীফকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনে উপস্থিত হন। তার উদ্দেশ্য ছিল একটি ট্রাভেল পারমিট সংগ্রহ করা সম্ভবত দেশে ফেরার শেষ প্রস্তুতি।
তিনি তখন শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। তার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে হাইকমিশন কর্তৃপক্ষ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুততার সঙ্গে তার ট্রাভেল পারমিট ইস্যুর প্রক্রিয়া শুরু করে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যে কাগজটি হয়তো তাকে নিজের মাটিতে ফেরার পথ খুলে দিত, সেটি হাতে পাওয়ার আগেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
হাইকমিশনের কনস্যুলার সেবা এলাকায় হঠাৎ করেই অরুণ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হলে তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয়। অ্যাম্বুলেন্সে উপস্থিত প্যারামেডিক নার্স তাকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ একজন প্রবাসীর জীবনের সংগ্রাম শেষ হয়ে যায় নিঃশব্দেই। পরবর্তীতে ঘটনাটি মালয়েশিয়ান পুলিশকে জানানো হলে তারা প্রয়োজনীয় প্রাথমিক তদন্ত সম্পন্ন করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়।
মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী, অরুণ সম্প্রতি একটি মাইল্ড স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মাত্রার ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। প্রবাসের কঠোর পরিশ্রম, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা তার শারীরিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অরুণের মৃত্যু যেন আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল প্রবাসজীবনের নির্মম বাস্তবতা। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে হাজারো কষ্ট সহ্য করে বিদেশে থাকা এই মানুষগুলো প্রায়ই নিজেদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কথা ভুলে যান।
অসুস্থ শরীর নিয়েও কাজ করে যাওয়া, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া, আর শেষ পর্যন্ত এমন করুণ পরিণতি এই গল্প শুধু অরুণের নয়, বরং হাজারো প্রবাসীর নীরব বাস্তবতা। বাংলাদেশ হাইকমিশন মরহুম অরুণের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছে এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে।
একই সঙ্গে মরদেহ দ্রুত বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অরুণ হয়তো স্বপ্ন দেখেছিলেন একদিন ফিরে যাবেন নিজের গ্রামে, পরিবারের কাছে। হয়তো হাতে তুলে দেবেন কষ্টার্জিত কিছু সঞ্চয়, হাসিমুখে বলবেন ‘আমি পেরেছি।’
প্রবাসের মাটিতে নিভে যাওয়া এই জীবন শুধু একটি মৃত্যুর খবর নয় এটি একটি পরিবারের ভেঙে পড়া স্বপ্ন, একটি অসমাপ্ত গল্প, আর হাজারো প্রবাসীর অদেখা কষ্টের প্রতিচ্ছবি।
