https://www.emjanews.com/

11741

surplus

প্রকাশিত

২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:৩৭

অন্যান্য

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারে পোলট্রি মুরগিতে ‘সুপারবাগ’: ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:৩৭

ছবি: সংগৃহিত

ব্রয়লার বা পোলট্রি মুরগিতে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে তৈরি হচ্ছে মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া বা ‘সুপারবাগ’, যা মানুষের জীবনরক্ষাকারী বহু অ্যান্টিবায়োটিককে অকার্যকর করে তুলছে। পাশাপাশি পোলট্রি খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনার কারণে পরিবেশও মারাত্মক হুমকির মুখে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘এশিয়ান-অস্ট্রালাশিয়ান জার্নাল অব ফুড সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি’-তে।

গবেষণায় দেখা যায়, দেশের মোট ব্রয়লার উৎপাদনের ৭০-৮০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা সরবরাহ করেন। তাদের অধিকাংশই ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ফিড ডিলার ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কথায় `সুরক্ষা' হিসেবে রোগ হওয়ার আগেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন।

এতে মুরগির মাংসে সিপ্রোফ্লক্সাসিন, এনরোফ্লক্সাসিন, টেট্রাসাইক্লিনসহ বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যাচ্ছে, যা সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি। খুচরা বাজার থেকে সংগৃহীত মাংসের নমুনায় ২২ শতাংশে ফ্লোরোকুইনোলোন এবং ১৮ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিনের অবশিষ্টাংশ মিলেছে।

আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো- দেশের পোলট্রি খামার থেকে সংগৃহীত ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার ৭৫ শতাংশেরও বেশি মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট, অর্থাৎ একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী। মুরগির অন্ত্রে ‘এমসিআর-১’ (mcr-1) জিনের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে, যা মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক কোলিস্টিনকে অকার্যকর করে দেয়।

গবেষকরা সতর্ক করে বলেন- খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে অল্পমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দীর্ঘমেয়াদে প্রবেশ করলে অ্যালার্জি, অঙ্গপ্রতঙ্গের বিষক্রিয়া, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।

এছাড়া পোলট্রি বর্জ্যও পরিবেশের জন্য সমান হুমকি। গবেষণায় বলা হয়, একটি ব্রয়লার মুরগি জীবদ্দশায় ১.৫–২ কেজি বর্জ্য ফেলে। দেশে বছরে ২০০ মিলিয়ন মুরগি উৎপাদিত হওয়ায় বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় জমি ও জলাশয়ে পড়ছে। এতে ভূগর্ভস্থ ও নদীর পানি দূষিত হচ্ছে এবং অ্যামোনিয়া গ্যাস নিঃসরণ বাড়ছে।

প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রয়লার শিল্প দেশের প্রোটিন সংকট দূর করছে, কর্মসংস্থানও তৈরি করছে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক সংকট এই অর্জনকে ধুলিসাৎ করতে পারে। এটি মোকাবিলায় আমাদের ‘ওয়ান হেলথ’ নীতি মেনে চলতে হবে-মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’

তিনি আরও বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক ব্যবহারে জোর দেওয়া, খামারে বায়োসিকিউরিটি বৃদ্ধি, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খামারিদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অবাধ বিক্রি বন্ধে কঠোর নীতি বাস্তবায়ন জরুরি।’

তার মতে, ‘সময় থাকতে সচেতন হতে পারলে এবং সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে পোলট্রি শিল্পকে নিরাপদ, লাভজনক ও টেকসই পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা আজকের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।’