ছবি: সংগৃহিত।
মানব সভ্যতার ইতিহাস দেখলে আমরা লক্ষ্য করি, হিংসা ও প্রতিশোধের চক্র সমাজে কতটা ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে। একবার ক্ষোভ আর রাগের বীজ বোনা হলে তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনে। হিংসা আর প্রতিশোধের চাষাবাদ বন্ধ করা না হলে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কখনও স্থায়ী হতে পারে না।
প্রথমত, হিংসা সমাজকে বিভক্ত করে। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যের উপর হিংসার হাত তোলার সুযোগ পায়, তখন মানুষে মানুষে বিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং রাষ্ট্রের স্তরে এই বিভাজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রতিশোধ ও হিংসার প্রভাবে যুদ্ধ, দাঙ্গা ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা জন্ম নেয়, যা একাধিক প্রজন্মকে প্রভাবিত করে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিশোধমূলক মনোভাব ব্যক্তিগত উন্নয়নকে ব্যাহত করে। একজন মানুষ যদি সবসময় অন্যের ক্ষতিপূরণের চিন্তায় মগ্ন থাকে, তাহলে সে নিজেকে, তার শিক্ষাকে, তার কর্মজীবনকে এগিয়ে নিতে পারে না। ক্ষোভ ও প্রতিশোধের চাষাবাদ মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলস্বরূপ, ব্যক্তি তার জীবনের সম্ভাব্য সাফল্য থেকে বঞ্চিত হয়।
তৃতীয়ত, হিংসা ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি শান্তি ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের মধ্যে প্রতিশোধের মনোভাবকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন কারণে রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংঘর্ষের ঘটনায় হিংসা ও প্রতিশোধের চক্র চোখে পড়ছে। পারিবারিক বিরোধ, প্রতিবেশী দ্বন্দ্ব কিংবা রাজনৈতিক সংঘর্ষ-সবক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, ক্ষোভ ও প্রতিশোধ মানুষের মননে কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সমাজে এই বীজ বোনার ফলাফল ভয়াবহ: শান্তি ধ্বংস, উন্নয়ন ব্যাহত এবং মানুষের আস্থার অবনতি।
হিংসা শুধু সংঘাতের কারণ নয়, এটি সমাজকেও বহুধা-বিভক্ত করে। যখন ক্ষোভ ও প্রতিশোধকে শক্তি হিসেবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখন আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা অশক্ত-ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। সম্প্রতি বিভিন্ন শহর ও গ্রামে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, ক্ষতিপূরণ বা প্রতিশোধের মনোভাব আবারও নতুন সংঘাতের সূত্রপাত করছে। এক কথায়, হিংসা হিংসার জন্ম দেয়-এক অবিরাম চক্র।
এই সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নয়, মানসিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও করা সম্ভব। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সহমর্মিতা, ক্ষমা, সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মূল্যবোধ শেখানো অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রদায় এবং পরিবারে শান্তি, ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রচার করা গেলে হিংসা ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব।
ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও সহাবস্থান ছড়িয়ে দেওয়া, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম, ধর্মালোচনা, রাজনৈতিক দল, গান, কবিতা, আলোচনা, সামাজিক উদ্যোগ, এমনকি ক্রিড়ার মাধ্যমেও হতে পারে, যেখানে ঘৃণা ও বিদ্বেষের পরিবর্তে শান্তি ও ঐক্যের বাণী প্রচার করা হয়, যেমনটি বিভিন্ন কবি, শিল্পী, সংগঠন ও সাধারণ মানুষ করে থাকেন। এটি ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও বৈশ্বিক স্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং গুজব বা উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির একটি প্রক্রিয়া।
অবশেষে, হিংসা ও প্রতিশোধের চাষাবাদ বন্ধ করার মূল দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের। প্রতিটি মানুষ যদি ক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে, সংলাপের পথ বেছে নেয় এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে, তাহলে সমাজে স্থায়ী শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অন্যথায় আমরা এমন একটি পৃথিবীতে বাঁচতে বাধ্য হব, যেখানে প্রতিটি ক্ষত, প্রতিটি বিরোধ ও প্রতিটি প্রতিশোধের হিসাব পরবর্তী প্রজন্মকে বিপন্ন করবে।
উপসংহার:
হিংসা ও প্রতিশোধ শুধু ক্ষণস্থায়ী প্রতিশোধপুর্ণ স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা আমাদের মানসিক শান্তি, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি ধ্বংস করে। তাই আমাদের সকলে সচেতন হয়ে হিংসা ও প্রতিশোধের চাষাবাদ বন্ধ করতে হবে এবং সমাজে শান্তি, ক্ষমাশীলতা ও মানবিকতার বীজ বোনা উচিত।