https://www.emjanews.com/

12264

opinion

প্রকাশিত

১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:০১

মতামত

বিজয়ের পথে বাংলাদেশ: ত্যাগ, সাহস ও ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণ

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:০১

ছবি: সংগৃহিত।

স্বপন কুমার সিং:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো হঠাৎ প্রাপ্ত ঘটনা নয়- এটি ছিল দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এসে যুদ্ধের গতিপথ চূড়ান্তভাবে বদলে যায়। স্বাধীনতা তখন আর কেবল স্বপ্ন নয়, বাস্তবতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।

নয় মাস ধরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা এই ভূখণ্ডে যে নির্মমতা চালিয়েছিল, তা ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়। নির্বিচারে গণহত্যা, নারী নির্যাতন, গ্রাম ধ্বংস আর বুদ্ধিজীবী হত্যার মধ্য দিয়ে তারা একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছিল। ভয় আর আতঙ্ক তখন ছিল মানুষের নিত্যসঙ্গী।

কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেই জ্বলে উঠেছিল প্রতিরোধের দীপশিখা। মুক্তিবাহিনীর সাহসী যোদ্ধারা ডিসেম্বরের শুরু থেকেই নতুন উদ্যমে আঘাত হানতে থাকেন। দেশের ভেতরে ও বাইরে সমন্বিত প্রতিরোধ পাকিস্তানি বাহিনীকে ক্রমশ কোণঠাসা করে তোলে।

একই সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ বাহিনী রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে ফেলে। আকাশপথে আঘাত, স্থলপথে অগ্রযাত্রা এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ- সব মিলিয়ে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব বুঝে যায়, পরাজয় অনিবার্য।

ঢাকা তখন কার্যত এক নিস্তব্ধ নগরী। প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, নাগরিক সেবা বন্ধ, শহরজুড়ে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। সামরিক কর্মকর্তাদের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে- ঢাকা পরিণত হয়েছিল এক ভূতুড়ে শহরে, যেখানে প্রতিরোধের শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছিল।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি আত্মসমর্পণের আলোচনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়।

রমনা রেসকোর্সে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত হয় সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান, যেখানে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র- বাংলাদেশ।

এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের মিত্রবাহিনী ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। সামরিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয় ইতিহাসের এক অনন্য মুহূর্ত। লাখো মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে সেদিন।

সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আত্মসমর্পণ করে প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় ২৪ বছরের শোষণ ও বঞ্চনার অধ্যায়। ঢাকার রাস্তায়, মানুষের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি, আনন্দ আর অশ্রু- এ ছিল মুক্তির কান্না।

বিজয় দিবস তাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি ত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। শহীদের রক্ত, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস আর সাধারণ মানুষের অসীম ধৈর্যের ফল এই স্বাধীনতা।

এই দিনে আমরা স্মরণ করি- স্বাধীনতা রক্ষা করা যেমন দায়িত্ব, তেমনি ইতিহাস জানা ও নতুন প্রজন্মকে জানানোও আমাদের কর্তব্য।