ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নীতির প্রভাব ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক রাজনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইউরোপে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও কৌশলগত উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আগ্রাসী প্রয়োগ, মিত্রদের প্রতি কঠোর বক্তব্য এবং একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও ট্রাম্প আমলে সেই ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন ইউরোপীয় ও ডেমোক্রেট নেতারা।
জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ৬২তম মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন-এ অংশ নেওয়া ডেমোক্রেট নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ট্রান্সআটলান্টিক জোটে যে ফাটল ধরেছে তা সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আস্থাহীনতার জন্ম দিয়েছে। তাদের মতে, ২০২৮ সালে ডেমোক্রেটরা হোয়াইট হাউজ পুনর্দখল করলেও যুক্তরাষ্ট্রের ‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’ পরিচয় আগের মতো আর ফিরে নাও আসতে পারে।
তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলন রোববার শেষ হয়। এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সিএনএন।
সম্মেলনে সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত একাধিক ডেমোক্রেট নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন অ্যারিজোনার সিনেটর মার্ক কেলি, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী জিনা রাইমন্ডো, মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার এবং সিনেটর ক্রিস মারফি, এলিসা স্লটকিন ও রুবেন গেলেগো।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম সম্মেলনে বলেন, তার অঙ্গরাজ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়েও বেশি স্থায়ী। তার বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান, ট্রাম্প চলে গেলেও ক্যালিফোর্নিয়া থাকবে। তবে সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি বুঝেছেন- যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
নিউজম বলেন, ইউরোপের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী হলেও এখন আর পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেক ইউরোপীয় নেতা মনে করছেন, দুই পক্ষের সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরে নাও যেতে পারে। তবুও ডেমোক্রেট সদস্যরা ইউরোপীয় নেতাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন এবং ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইউরোপকে কিছুটা আশার বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ট্রান্সআটলান্টিক জোট পুনরুজ্জীবিত করতে চায়, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ একসঙ্গে নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করতে পারে। তার ভাষায়, “আমরা আলাদা হতে চাই না, বরং পুরোনো বন্ধুত্ব পুনরুজ্জীবিত করতে চাই।”
অন্যদিকে সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মের্জ বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের দাবি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। এমনকি তিনি মন্তব্য করেন, সেই নেতৃত্ব হয়তো হারিয়েও গেছে।
তিনি আরও জানান, ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে গোপন আলোচনা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ইউরোপের নিরাপত্তা নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের নীতির প্রভাবে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ঐতিহাসিক জোট পুনরুদ্ধার হবে নাকি নতুন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হবে- তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর।
